ঢাকা

এসএসসির খাতা পুনর্মূল্যায়নে ১২ লাখের বেশি আবেদন, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
এবারের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য ১২ লাখের বেশি আবেদন জমা পড়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বিপুলসংখ্যক আবেদনকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এ পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে প্রায় সব শিক্ষার্থীই উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ নিতে চাইছে। এ কারণে খাতা পুনর্মূল্যায়নের বর্তমান প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে সরকার।

সোমবার ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত ‘কিউএস বাংলাদেশ ফোরাম ২০২৬’-এ প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন শিক্ষামন্ত্রী। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসএসসির উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এবার উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য ১২ লাখের বেশি আবেদন পড়েছে। এত বিপুলসংখ্যক খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তাই কোন ধরনের উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের আওতায় আসবে এবং কোন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষার্থী পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করতে পারবে—এসব বিষয় নির্দিষ্ট করে নতুন নীতিমালা তৈরির চিন্তা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে এত বেশি উত্তরপত্র পুনরায় যাচাই করা সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া। তাই পুনর্মূল্যায়নের সুযোগকে আরও সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।

শিক্ষায় এআই ব্যবহারে গুরুত্ব

কিউএস বাংলাদেশ ফোরামের আলোচনায় দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন শিক্ষামন্ত্রী। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নে এআইকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।

এহছানুল হক মিলন বলেন, দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হলে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের (টিভিইটি) কোনো বিকল্প নেই। শুধু সাধারণ উচ্চশিক্ষার ওপর নির্ভর না করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও টিভিইটির ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

তার মতে, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষা দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাক্রম ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সাজানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

কিউএস র‍্যাংকিংয়ে উন্নতির জন্য গবেষণায় জোর

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে গবেষণায় বিনিয়োগ ও গবেষণার মান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী।

তিনি বলেন, কিউএস রেটিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান আরও উন্নত করতে হলে গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, জ্ঞান উৎপাদন এবং বৈশ্বিক একাডেমিক সহযোগিতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে আরও ভালো অবস্থানে যেতে পারবে।

একই সঙ্গে তিনি ‘ক্রস-বর্ডার এডুকেশন’ বা সীমান্তপারের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মেধাবীদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ

বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কোনো ঘাটতি নেই বলেও মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের শিক্ষার্থীরা বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফলাফল করছে। গবেষণার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করছে।

বিদেশে থাকা এসব মেধাবী বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেন’ বা বিদেশে থাকা দক্ষ ও মেধাবী জনশক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিসর আরও সম্প্রসারিত করতে হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করা বাংলাদেশি শিক্ষক, গবেষক ও পেশাজীবীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কাজে লাগানো গেলে গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা সহজ করার উদ্যোগ

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে পড়তে আসার ক্ষেত্রে ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক সহজে বাংলাদেশের ভিসা পেতে পারবেন।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও পরিচিত হবে এবং একই সঙ্গে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষা খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈদেশিক আয়—দুই ক্ষেত্রেই সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

কিউএস বাংলাদেশ ফোরামে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলোচনা

‘কিউএস বাংলাদেশ ফোরাম ২০২৬’-এ দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং, গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে দেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এবং ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির চেয়ারম্যান মো. সবুর খান, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য ইশতিয়াক আবেদিন, কিউএসের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার জেসন নিউম্যান এবং কিউএস ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান অশ্বিন ফার্নান্দেজ।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা ও আন্তর্জাতিকীকরণের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপরই আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এসএসসির উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নে বিপুলসংখ্যক আবেদন এবং এ নিয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। একদিকে মাধ্যমিক পর্যায়ে পরীক্ষার মূল্যায়নব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় জোর—দুই ক্ষেত্রেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কর্মমুখী করার পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স