রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ-এ ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ এবং সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবিতে গভীর রাতে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। শনিবার (৯ মে) রাত ১১টার দিকে কলেজের বিভিন্ন ছাত্রীনিবাসের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে এ কর্মসূচি পালন করেন। বিক্ষোভের সময় কলেজের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে বাইরে বের হয়ে এসে তাঁরা স্লোগান দেন এবং একটি রাজনৈতিক ব্যানার অপসারণ করে তাতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় কর্মকাণ্ডের কারণে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। তাই তারা কলেজ ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করে নিরপেক্ষ ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’ লেখা মুছে ফেলার অভিযোগ
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যায় কলেজের মূল ফটকে লেখা ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’ কথাটি কালো রং দিয়ে মুছে ফেলা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন।
জানা গেছে, হজরত রাবেয়া বসরী ছাত্রীনিবাসসহ কলেজের বিভিন্ন আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা রাত ১১টার দিকে মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় তাঁরা ‘ছাত্ররাজনীতির ঠিকানা, এই ইডেনে হবে না’সহ নানা স্লোগান দেন।
তালা ভেঙে ফটকের বাইরে অবস্থান
প্রথমে শিক্ষার্থীরা মূল ফটকের সামনে অবস্থান নিলেও একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ক্যাম্পাসের কয়েকটি ফটকের তালা ভাঙার চেষ্টা করেন। পরে তারা প্রধান ফটকের তালা ভেঙে বাইরে বের হয়ে আসেন।
ফটকের বাইরে এসে তাঁরা সড়কের পাশে টানানো একটি ব্যানার নামিয়ে ফেলেন। ব্যানারটিতে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের কয়েকজন সংসদ সদস্যকে শুভেচ্ছা জানিয়ে কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রার্থী তৈয়বা ত্বাহার নাম উল্লেখ ছিল।
ব্যানারে আগুন দেওয়ার চেষ্টা
বিক্ষোভকারীরা ব্যানারটি ছিঁড়ে তাতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তা সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে ফেলতে পারেননি। পরে তাঁরা কলেজের মূল ফটকে কালো রঙে বড় করে ‘সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত ইডেন ক্যাম্পাস’ লিখে দেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা জানান, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়; বরং শিক্ষার স্বার্থে ক্যাম্পাসকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে চান।
শিক্ষার্থীদের দাবি
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, কলেজে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা নানা চাপ ও বিভাজনের মধ্যে পড়ে। এতে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।
তাঁদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশ। সে কারণে কলেজ প্রশাসনের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে ক্যাম্পাসে সব ধরনের দলীয় রাজনীতি বন্ধ করা।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন।
তিনি লিখেছেন, ছাত্ররাজনীতিতে অংশগ্রহণ, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একজন শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার।
একই পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, অতীতেও বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিতে সংগঠিত কিছু আন্দোলনের পেছনে গোপনে বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা ছিল।
প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি
রাত পর্যন্ত এ ঘটনায় কলেজ প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের দাবি এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনকে দ্রুত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
ছাত্ররাজনীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক
ইডেন মহিলা কলেজের এ বিক্ষোভ আবারও দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। এক পক্ষ ছাত্ররাজনীতিকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে দেখলেও অন্য পক্ষ মনে করছে, শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে ক্যাম্পাসকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। শনিবার রাতের এ বিক্ষোভ সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।