গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় উপেক্ষা করা হলে তা গণ–অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে বলে মন্তব্য করেছেন আলোচকেরা। তাঁরা বলেন, রাষ্ট্রের বৈধতা, সাংবিধানিক কাঠামো এবং জনগণের প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না করা হলে দেশে নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে।
শনিবার (১০ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘গণভোট: বৈধতার ভিত্তি জনগণ না সংবিধান?’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব মতামত তুলে ধরেন বক্তারা। সভার আয়োজন করে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।
‘জনগণের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করলে সংকট বাড়বে’
আলোচকেরা বলেন, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত উপেক্ষা করার প্রবণতা থাকলে তা বৈধতার সংকট আরও গভীর করতে পারে। তাঁদের মতে, গণভোটের মতো সরাসরি জনমতের ফলাফলকে অগ্রাহ্য করা হলে তা শুধু রাজনৈতিক নয়, নৈতিক সংকটও তৈরি করবে।
সভায় বক্তারা বলেন, জাতীয় সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার এবং জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সাবেক আইজিপির অভিমত: ইতিহাসেই আছে গণআকাঙ্ক্ষার শক্তি
আলোচনায় অংশ নিয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে সবসময়ই জনগণের আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন এবং ১৯৯০ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, এসব ক্ষেত্রে সাংবিধানিক কাঠামোর পাশাপাশি জনগণের চাপ ও আকাঙ্ক্ষা বড় ভূমিকা রেখেছে।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং একটি নৈতিক পুনর্জাগরণের প্রতিফলন।
বাহারুল আলম বলেন, “গণভোটকে কেউ জনগণের প্রত্যক্ষ মতপ্রকাশের সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রশ্নে বিচার করছেন। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সংঘাত নয়, সমন্বয় প্রয়োজন।”
‘গণভোট উপেক্ষা মানে রাষ্ট্রের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা’
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গীতিকবি ও রাষ্ট্রচিন্তক শহীদুল্লাহ ফরায়জী। তিনি বলেন, গণভোটে জনগণের রায়কে একদিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং অন্যদিকে তা কার্যকর না করার অবস্থান রাষ্ট্রের বৈধতার ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তার মতে, এই দ্বৈততা রাষ্ট্রকে গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটে ঠেলে দিচ্ছে।
গণপরিষদের পক্ষে যুক্তি আইন বিশেষজ্ঞের
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শরীফ ভুঁইয়া বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় ঐকমত্যের অভাব।
তিনি বলেন, আদালতের দায়িত্ব সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হলেও মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে তিনি গণপরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
তার ভাষায়, “জনগণ সংবিধানেরও মালিক। গণপরিষদই অভ্যুত্থানের স্পিরিট রক্ষা করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্পণ করেছে।
গণভোট জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট: অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, গণভোট হলো জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট। তাই এর ফলাফল বাস্তবায়ন রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।
তিনি বলেন, জনগণের ইচ্ছাকে আইনি কাঠামোয় রূপান্তর না করলে তা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী হবে। তাঁর মতে, গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, গণভোটে সেটিই প্রতিফলিত হয়েছে।
রাজনৈতিক ইতিহাসের শিক্ষা ও সমালোচনা
কবি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রিকতা সবসময়ই সংকট তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, “দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে যাঁরাই ক্ষমতায় গেছেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিণতি সুখকর হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশে পর্যাপ্ত আলোচনার অভাব রয়েছে, যা গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার জন্য উদ্বেগজনক।
রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি ও রাজনৈতিক আহ্বান
সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূম বলেন, সাম্প্রতিক গণ–অভ্যুত্থানে জনগণের বিপুল আত্মত্যাগ থাকলেও এর সুফল সীমিত কিছু গোষ্ঠীর হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএনপি গণভোটের চারটি প্রশ্নের মধ্যে একটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তবে সেই আপত্তি যদি দলীয় অবস্থান থেকে আসে, তাহলে জাতীয় সমঝোতার সুযোগ এখনো রয়েছে।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান জানান।
অংশগ্রহণকারীরা
আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ হাসিবউদ্দিন হোসেন, কামরুল হাসান চৌধুরী, মঞ্জুর কাদির, মাহবুবুল আলম চৌধুরী ও মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা।
সভা সঞ্চালনা করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া।
রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা
বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা সভা গণভোট, সংবিধান সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় বৈধতার প্রশ্নে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে জনগণের রায় বনাম সাংবিধানিক কাঠামোর দ্বন্দ্ব নিয়ে যে মতভেদ রয়েছে, তা আগামী রাজনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।