ঢাকা

কূটনীতিকদের নাহিদের বার্তা: আন্দোলন নয়, কূটনৈতিক সমাধানই অগ্রাধিকার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর ওপর জোর দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সরকার যদি বিরোধী দলের সহযোগিতাকে উপেক্ষা করে, তবে রাস্তায় নামা তাদের শেষ বিকল্প হবে। তবে তিনি একই সঙ্গে স্পষ্ট করেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তারা চান না এবং সমাধান আলোচনার মাধ্যমেই খুঁজতে হবে।

শনিবার (১০ মে) সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘সংস্কারে অচলাবস্থা: এগোনোর পথ’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

‘রাস্তায় যাওয়া আমাদের শেষ অপশন’

কূটনীতিকদের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, “সংস্কার বাস্তবায়নে আমরা আবারও রাস্তায় যেতে চাই না। আমরা কোনো অস্থিতিশীলতা চাই না। রাস্তায় যাওয়া আমাদের শেষ অপশন।”

তিনি আরও বলেন, সরকার যদি রাজনৈতিক সংলাপ ও বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব না দেয়, তবে জনআন্দোলনের পথেই যেতে বাধ্য হতে পারে বিরোধী পক্ষ।

‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবি

নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান জাতীয় সংসদকে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান সংস্কার পরিষদে রূপান্তর করা উচিত—এ বিষয়ে তারা এখনো আশাবাদী।

তার মতে, সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তনের জন্য একটি বিশেষ সাংবিধানিক কাঠামো প্রয়োজন, সাধারণ সংশোধন প্রক্রিয়া যথেষ্ট নয়।

তিনি বলেন, “আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ চাই। কারণ মৌলিক পরিবর্তনের জন্য সেটিই সবচেয়ে কার্যকর পথ।”

‘সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে’

সংলাপে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকার সংস্কার ইস্যুতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। তাঁর ভাষায়, “সরকারি দল এরই মধ্যে সংস্কার প্রশ্নে নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।”

তিনি বলেন, সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণে এগিয়ে আসেনি এবং ‘জুলাই সনদ’ ও এর বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।

তার অভিযোগ, সরকার সংস্কার ইস্যুকে রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করেছে, যা আসলে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়ার কথা ছিল।

‘সংস্কার শুধু নির্বাচন নয়, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বিষয়’

নাহিদ ইসলাম বলেন, সংস্কার কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিষয়।

তিনি বলেন, “সংস্কার কোনো দলীয় এজেন্ডা নয়। এটি জাতীয় পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন।”

মৌলিক সংস্কারের অগ্রাধিকার তালিকা

সংলাপে তিনি কয়েকটি মৌলিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এর মধ্যে রয়েছে—

উচ্চকক্ষ গঠন, যাতে আইন প্রণয়নে ভারসাম্য আসে
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা

তিনি বলেন, এসব সংস্কার কার্যকর না হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরে আসবে না।

‘বল এখন সরকারের কোর্টে’

কূটনীতিকদের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সরকারের। সংস্কার বাস্তবায়ন তারা কীভাবে করবে, সেটিই নির্ধারণ করবে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

তার ভাষায়, “বল এখন সরকারের কোর্টে। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কীভাবে পরিস্থিতি ম্যানেজ এবং প্রত্যাশা পূরণ করতে চায়।”

তিনি আরও বলেন, সংস্কার কোনো একক দলের স্বার্থ নয়, বরং এটি জাতীয় গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করার ভিত্তি।

আন্দোলনের ইঙ্গিত, তবে শান্তিপূর্ণ অবস্থান

সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার বা বিরোধী পক্ষ সংস্কার ইস্যুতে “ছলচাতুরি” করছে।

তবে তিনি জানান, তাঁদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ও অহিংস থাকবে। তিনি বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণ ও অহিংসভাবে আন্দোলন করব। রাজপথে কর্মসূচি শুরু হয়েছে।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, আন্দোলনের মাত্রা কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে সরকারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।

কূটনীতিকদের অংশগ্রহণ

অনুষ্ঠানে উপস্থিত কূটনীতিকরা মূলত এনসিপির নেতাদের বক্তব্য শোনার উদ্দেশ্যে অংশ নেন বলে জানান। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে ছিল নরওয়ে, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও ডেনমার্কসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের দূতাবাস।

এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI) এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (DI)-এর প্রতিনিধিরাও আলোচনায় অংশ নেন।

আলোচনা ও অংশগ্রহণ

সংলাপে আরও বক্তব্য দেন সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মো. আবদুল আলীম, নাগরিক কোয়ালিশনের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাসরুর এবং এনসিপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দলের যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ। উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য মাহমুদা আলম মিতু এবং দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিনসহ অন্যান্য নেতারা।

রাজনৈতিক বার্তা ও ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংলাপের মাধ্যমে এনসিপি সংস্কার ইস্যুকে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে আরও গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করতে চেয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের প্রতি রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবেও এই অবস্থানকে দেখা হচ্ছে।

তবে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত থাকলেও, রাস্তায় আন্দোলনের হুঁশিয়ারি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স