প্রায় দুই দশকের আলোচনা-আলোচনার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি বহুল প্রত্যাশিত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওয়াশিংটনে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন শর্ত আরোপ করে পুরো বিষয়টিকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেন। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—কী এমন ঘটেছিল, যার কারণে এত দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করলেন ট্রাম্প?
সিএনএনের অনুসন্ধান বলছে, হোয়াইট হাউস, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, কংগ্রেস, রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ—সব মিলিয়ে এক জটিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত এসেছে।
বহু প্রতীক্ষিত চুক্তি
গত বুধবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। অন্যদিকে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী রিয়াদ থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন।
দীর্ঘদিনের আলোচনার পর হওয়া এই চুক্তিতে সৌদি আরব তাদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
মাত্র ২৪ ঘণ্টায় বদলে গেল পরিস্থিতি
চুক্তি স্বাক্ষরের পরদিনই নাটকীয় মোড় নেয় পুরো ঘটনা।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন, এই চুক্তি কার্যকর করতে হলে সৌদি আরবকে অবশ্যই আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে হবে। তাঁর প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল।
একই সঙ্গে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন, সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হবে না।
এই দুই শর্তই আগে প্রকাশিত চুক্তির অংশ ছিল না বলে জানা যায়। ফলে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে তাৎক্ষণিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
কেন ক্ষুব্ধ ছিলেন ট্রাম্প?
সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা একাধিক সূত্রের দাবি, চুক্তি প্রকাশের আগেই ট্রাম্প অসন্তুষ্ট ছিলেন।
তাঁর অভিযোগ ছিল, জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট তাঁকে আগে থেকে জানাননি যে বুধবারই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হবে।
হোয়াইট হাউসের একটি সূত্র জানায়, প্রেসিডেন্টের দপ্তর চেয়েছিল সেদিন চুক্তির ঘোষণা স্থগিত রাখা হোক। কিন্তু সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে জ্বালানি মন্ত্রণালয় অনুষ্ঠান চালিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, অনুষ্ঠান শেষে ক্রিস রাইট ফক্স বিজনেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, তখনও চুক্তিটি পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। কারণ, কংগ্রেসে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র তখনও জমা দেওয়া হয়নি। ফলে আগেভাগে ঘোষণা দেওয়ায় প্রেসিডেন্ট ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা ক্ষুব্ধ হন।
রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমের সমালোচনায় চাপ
চুক্তির পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমগুলো এর কঠোর সমালোচনা শুরু করে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সম্পাদকীয়তে প্রশ্ন তোলে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো শর্ত ছাড়াই কেন সৌদি আরবকে এমন বড় কূটনৈতিক সুবিধা দেওয়া হলো।
সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও একই ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সামনে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার শর্ত রেখেছিলেন।
অন্যদিকে ফক্স নিউজ–এর জনপ্রিয় উপস্থাপক ব্রায়ান কিলমিডও প্রশ্ন তোলেন, কেন বাইডেন প্রশাসনের তুলনায় ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবকে কম শর্তে একই সুবিধা দিতে যাচ্ছে।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, এসব সমালোচনা ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে এবং এরপরই তিনি নতুন শর্ত আরোপের সিদ্ধান্ত নেন।
হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যা
হোয়াইট হাউস অবশ্য দাবি করেছে, সৌদি আরবের জন্য এই শর্ত নতুন নয়।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি কার্যকর হওয়ার পূর্বশর্তই হলো সৌদি আরবের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়া।
তাঁর ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জ্বালানি দল এ বিষয়ে পুরোপুরি একমত এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এটিই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
তবে সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে এই শর্ত যুক্ত করা হবে—এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়া অনেক কর্মকর্তাও আগে থেকে জানতেন না।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পাল্টা অবস্থান
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় হোয়াইট হাউসের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বেন ডিটারিখ বলেন, পুরো প্রক্রিয়ায় হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখা হয়েছিল।
তাঁর দাবি, আলোচনার শুরু থেকে চুক্তি ঘোষণার প্রতিটি ধাপেই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্পৃক্ত রাখা হয়েছিল। ভিন্ন কোনো দাবি সত্য নয়।
তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক সহযোগিতা ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস—উভয়ের লক্ষ্যই সংঘাত নয়, বরং বাণিজ্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা।
ইসরায়েলের উদ্বেগ কি প্রভাব ফেলেছে?
চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরির পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কি শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের ওপর প্রভাব খাটিয়েছেন?
সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা ইসরায়েলের দুটি সূত্র জানিয়েছে, নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন সৌদি আরবের সঙ্গে হওয়া চুক্তিতে অন্তত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্তটি অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
কারণ, সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে—এমন আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে রয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউস এ দাবি নাকচ করেছে।
প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তাঁর দাবি, প্রেসিডেন্ট কেবল তাঁর দীর্ঘদিনের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ শুরু থেকেই এই চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাঁদের মতে, সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অতিরিক্ত পরিদর্শন ব্যবস্থা বা অ্যাডিশনাল প্রটোকল বাধ্যতামূলক না করায়ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে চুক্তির সমর্থকদের যুক্তি, সৌদি আরব যেভাবেই হোক নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে চায়। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অংশীদার হলে অন্তত দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর ওয়াশিংটনের কিছুটা প্রভাব থাকবে। অন্যথায় চীন বা রাশিয়া এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
ভবিষ্যৎ কী?
চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র এক দিনের মধ্যে নতুন শর্ত আরোপ করায় এখন এর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে দুই দেশ কী ধরনের সমঝোতায় পৌঁছায় এবং কংগ্রেসে চুক্তিটি কতটা সমর্থন পায়—এসব বিষয়ের ওপরই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি পারমাণবিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ।
একই সঙ্গে এই ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, মধ্যপ্রাচ্যনীতি এবং ইসরায়েল–সৌদি সম্পর্ককে ঘিরে কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের জটিল বাস্তবতাকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।