অধিভুক্ত কলেজগুলোতে শিক্ষক–সংকট কমানো এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদানের মান উন্নত করতে বিষয়ভিত্তিক খণ্ডকালীন ‘শিক্ষক পুল’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এ জন্য খণ্ডকালীন শিক্ষক পুল গঠনের নীতিমালা অনুমোদন করা হয়েছে। এই পুলে অবসরপ্রাপ্ত যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং বিভিন্ন পেশায় দক্ষ ব্যক্তিদের জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষক–সংকট কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা প্রচলিত একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।
শনিবার গাজীপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের ১০৩তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহর সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পুলে কারা থাকবেন
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে নতুন ও দক্ষতাভিত্তিক কিছু বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক পাওয়া অনেক কলেজের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ভিত্তিক খণ্ডকালীন শিক্ষক পুল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ বিশেষজ্ঞদের তালিকাভুক্ত করা হবে।
প্রয়োজন অনুযায়ী অধিভুক্ত কলেজগুলো এসব শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞের সেবা নিতে পারবে। ফলে একটি কলেজে স্থায়ীভাবে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ না থাকলেও নির্দিষ্ট বিষয়ের পাঠদান চালু রাখা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, একজন শিক্ষার্থী যেন পড়াশোনা শেষ করে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেন, সেটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অবসর নেওয়া অভিজ্ঞ শিক্ষকদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ের দক্ষ বিশেষজ্ঞদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ তৈরি করা হবে।
ফেল করা শিক্ষার্থীদের আবার পরীক্ষার সুযোগ
একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন শেষ করার সুযোগ বাড়াতেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্নাতক (সম্মান) কোর্সের ২০১৩–১৪ থেকে ২০১৭–১৮ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বিশেষ বিবেচনায় আরও একবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে শিক্ষাজীবন আটকে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ বিবেচনায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে এসব শিক্ষার্থী তাঁদের অসম্পূর্ণ ডিগ্রি শেষ করার সুযোগ পাবেন।
স্নাতক পর্যায়ে যুক্ত হচ্ছে ‘অ্যাপ্লায়েড আইসিটি’ ও ‘ফাংশনাল ইংরেজি’
শুধু পরীক্ষার সুযোগ নয়, শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী দক্ষতা বাড়াতেও পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
স্নাতক (পাস) ও স্নাতক (সম্মান) প্রোগ্রামের দ্বিতীয় বর্ষে চার ক্রেডিটের ‘অ্যাপ্লায়েড আইসিটি কোর্স’ এবং প্রথম বর্ষে ‘ফাংশনাল ইংরেজি কোর্স’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ দুটি কোর্সের সিলেবাস ও রেগুলেশনও অনুমোদন করা হয়েছে।
অ্যাপ্লায়েড আইসিটি কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। অন্যদিকে ফাংশনাল ইংরেজি কোর্সের মাধ্যমে দৈনন্দিন যোগাযোগ, উচ্চশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ইংরেজি দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিক্ষার্থীদের শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং কর্মজীবনে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতেই পাঠ্যক্রমে এসব বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে।
গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং ও ওয়েব ডিজাইন
বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্তির অনুমোদনও দিয়েছে একাডেমিক কাউন্সিল। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং ও ওয়েব ডিজাইনসহ কয়েকটি বিষয়।
প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব দক্ষতার চাহিদাও বাড়ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে এসব বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পুলের উদ্যোগের সঙ্গেও এসব দক্ষতাভিত্তিক বিষয়ের যোগসূত্র রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যুক্ত করা গেলে শিক্ষার্থীরা বইভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকেও শেখার সুযোগ পাবেন।
বিসিএস ও পিএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে উদ্যোগ
সভায় তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি (পাস) এবং এক বছর মেয়াদি মাস্টার্স (প্রিলিমিনারি) কোর্স সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের সনদের বিষয়টিও আলোচনা করা হয়।
বিসিএসসহ বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) বিভিন্ন পরীক্ষায় এসব শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার দাবি রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কমিটি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টির চূড়ান্ত সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।
কম সিজিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়েও ভাবনা
শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকাতেও একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় আলোচনা হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থীর সিজিপিএ ২ দশমিক ২৫-এর কম, তাঁদের বিশেষ বিবেচনায় মানোন্নয়ন পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মনে করছে, কম সিজিপিএর কারণে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাঁদের আরেকবার নিজেদের ফল উন্নত করার সুযোগ দেওয়া হলে শিক্ষাজীবন শেষ করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণের বিষয়টি পরবর্তী প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
এলএলবি (সম্মান) কোর্সের নতুন রেগুলেশন অনুমোদন
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে চার বছর মেয়াদি এলএলবি (সম্মান) কোর্স পরিচালনার জন্য অধিভুক্তি রেগুলেশনও অনুমোদন করেছে একাডেমিক কাউন্সিল।
এর ফলে আইন বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কলেজগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কাঠামো ও নিয়মকানুন অনুসরণের সুযোগ তৈরি হবে।
পরীক্ষা ও ফলাফল নিয়েও সিদ্ধান্ত
সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা ও অনুমোদন করা হয়। পাশাপাশি শৃঙ্খলা কমিটির বিভিন্ন সুপারিশ ও সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন কারিকুলাম অনুমোদনের বিষয়টিও সভার আলোচনায় ছিল। অর্থাৎ শিক্ষক–সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন, পরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং একাডেমিক প্রশাসনকে আরও কার্যকর করার মতো একাধিক বিষয়কে একই সঙ্গে গুরুত্ব দিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
শিক্ষার সঙ্গে দক্ষতার সমন্বয়ে জোর
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেশের বিপুলসংখ্যক কলেজে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক–সংকট কমানো এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিষয়ভিত্তিক খণ্ডকালীন শিক্ষক পুল গঠনের সিদ্ধান্ত সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নতুন করে শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করার মাধ্যমে তাঁদের দীর্ঘ কর্মজীবনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি ও অন্যান্য পেশাগত ক্ষেত্রে দক্ষ বিশেষজ্ঞদের শ্রেণিকক্ষে যুক্ত করা গেলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা আরও বাস্তবমুখী করার সুযোগ তৈরি হবে।
উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহর বক্তব্যেও এ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যেন শুধু পড়াশোনা শেষ না করে প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করছে।
সভায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান, সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. নাজমুল হোসাইন, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এসব সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে অধিভুক্ত কলেজগুলোর শিক্ষক–সংকট মোকাবিলায় নতুন একটি ব্যবস্থা চালু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমে প্রযুক্তি ও ভাষাগত দক্ষতা যুক্ত করার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাকে আরও কর্মমুখী করার উদ্যোগও এগিয়ে যাচ্ছে।