প্রায় তিন দশক ধরে হেলেন ইয়াফে কিউবায় যাতায়াত করছেন। এক ভয়াবহ ক্যাটাগরি–ফোর হারিকেনের সময় তিনি যখন একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন তার চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য—প্রবল ঝড়ের মাঝেও সেখানে কোনো বিশৃঙ্খলা বা আতঙ্ক নেই। সবাই আগে থেকেই জানত, কার কী দায়িত্ব।
এই অভিজ্ঞতাই কিউবার রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির এক গুরুত্বপূর্ণ দিককে সামনে আনে—সংগঠিত জনভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আর এখন সেই একই মডেলকে দেশটি প্রয়োগ করতে চাইছে একটি ভিন্ন ধরনের হুমকির ক্ষেত্রে: সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র হামলা।
এই প্রেক্ষাপটেই বিশ্লেষকদের মতে, কিউবার নিরাপত্তা নীতি এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।
যুক্তরাষ্ট্র–কিউবা উত্তেজনার নতুন পর্ব
আল-জাজিরা–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিউবা নিয়ে কঠোর বক্তব্য বেড়েছে। একই সঙ্গে সাবেক এক ঘটনার পুনরায় আইনি তৎপরতা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের একটি বিমান দুর্ঘটনা–সংক্রান্ত ঘটনায় কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো–এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন অভিযোগ গঠন পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
এই ঘটনার পর কিউবা–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায় বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
‘ওয়ার অব অল পিপল’: কিউবার প্রতিরক্ষা দর্শন
কিউবা ১৬ মে প্রকাশ করে “সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সুরক্ষায় পারিবারিক নির্দেশিকা”—যেখানে সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের করণীয় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই নির্দেশিকার ভিত্তি হলো কিউবার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা নীতি—ওয়ার অব অল পিপল বা “জনযুদ্ধ”।
এই নীতি অনুযায়ী:
পুরো জনগণকে সামরিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হয়
স্থানীয় মিলিশিয়া ইউনিট সক্রিয় রাখা হয়
বেসামরিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক প্রতিটি এলাকায় বিস্তৃত থাকে
হেলেন ইয়াফের মতে, “কিউবার প্রতিটি নাগরিকই এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ এবং সামরিকভাবে প্রশিক্ষিত।”
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও সামরিক ইঙ্গিত
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ একাধিকভাবে বেড়েছে:
ক্যারিবীয় অঞ্চলে নজরদারি বিমানের টহল বৃদ্ধি
কিউবাকে “জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি” হিসেবে ঘোষণা
সামরিক শক্তি ব্যবহারের রাজনৈতিক আলোচনা
নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু বক্তব্যে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবাকে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতার কারণে দীর্ঘদিনের “নিরাপত্তা হুমকি” হিসেবে বর্ণনা করেন।
কিউবার অবস্থান: “রক্তবন্যা ঘটবে”
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-ক্যানেল সতর্ক করে বলেন, কোনো ধরনের মার্কিন সামরিক অভিযান “রক্তবন্যা” ডেকে আনতে পারে।
একই সঙ্গে কিউবা সরকার স্পষ্ট করেছে—তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসন প্রতিহত করা হবে।
সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক
বিশ্লেষকদের মধ্যে কিউবার সামরিক সক্ষমতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
কারও মতে:
কিউবার সেনাবাহিনী তুলনামূলকভাবে প্রশিক্ষিত
দীর্ঘ প্রস্তুতির কারণে প্রতিরোধ সক্ষমতা শক্তিশালী
আবার অন্যদের মতে:
সামরিক সরঞ্জাম পুরনো
আধুনিক যুদ্ধ সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে
তবে সবাই একমত যে, কিউবার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনগণের সংগঠিত প্রতিরোধ কাঠামো।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া
বিশ্লেষক কার্লোস মালামুদ মনে করেন, কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছাকাছি হওয়ায় সম্ভাব্য সংঘাতে এটি আলাদা মাত্রার ঝুঁকি তৈরি করবে।
তার মতে, কোনো হামলা হলে তা শুধু দ্বীপে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডেও প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে হেলেন ইয়াফে বলেন, ভেনেজুয়েলা–মডেল কিউবায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ দেশটির প্রতিরক্ষা কাঠামো অনেক বেশি সংগঠিত।
সম্ভাব্য গোয়েন্দা তথ্য ও বিতর্ক
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কিউবা ৩০০টি ড্রোন সংগ্রহ করেছে এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলার পরিকল্পনা করছে।
তবে এই তথ্যের সত্যতা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। কিউবা সরকার এটিকে “হামলার অজুহাত তৈরি” করার চেষ্টা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ
কিউবা এখন গভীর অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে:
জ্বালানি সংকট
বিদ্যুৎ ঘাটতি
খাদ্য ও সরবরাহ সংকট
ভেনেজুয়েলার সহায়তা কমে যাওয়া
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুর্বলতা সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
“মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু” দর্শন
কিউবার রাষ্ট্রীয় আদর্শে “মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু” একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্লোগান। এই ধারণা অনুযায়ী, দেশটির প্রতিরক্ষা কেবল সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নয়, বরং পুরো জনগণের সম্মিলিত দায়িত্ব।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মনোভাবই কিউবার প্রতিরক্ষা কৌশলের মূল ভিত্তি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কিউবা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি, সামরিক হুমকি এবং প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে একটি জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউবা সামরিকভাবে দুর্বল হলেও সংগঠিত জনভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এটিকে একটি “অপ্রচলিত কিন্তু কঠিন লক্ষ্য” হিসেবে ধরে রাখে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন এখন একটাই—এই উত্তেজনা কি কেবল কূটনৈতিক চাপেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই কোনো সংঘাতের দিকে গড়াবে?