রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন করে ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। ইউক্রেনের দাবি, এই হামলায় রাশিয়া প্রথমবারের মতো পূর্ণমাত্রায় তাদের পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওরেসনিক’ ব্যবহার করেছে।
রোববার ভোরে চালানো এই হামলায় অন্তত চারজন নিহত এবং চার শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ। নিহতদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। হামলার তীব্রতায় রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ রাতভর পাতাল রেলস্টেশন ও ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া মধ্য ইউক্রেনের বিলা তেরকভা শহরে ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। তাঁর ভাষায়, এই হামলায় পানি সরবরাহ কেন্দ্র, বাজার, আবাসিক ভবন ও স্কুলসহ বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
জেলেনস্কি টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, “তারা সত্যিই উন্মাদ হয়ে গেছে।” তিনি জানান, তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি পানি সরবরাহকেন্দ্রে আঘাত হানে এবং একটি বাজার পুরোপুরি পুড়ে যায়। বহু আবাসিক ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দিবাগত রাত থেকে শুরু হওয়া এই সমন্বিত হামলায় রাশিয়া মোট ৬০০টি ড্রোন এবং ৯০টি বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। আকাশ, স্থল ও সমুদ্র—তিন দিক থেকেই হামলা চালানো হয়।
যদিও ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৫৪৯টি ড্রোন এবং ৫৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, তবুও বহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। আরও ১৯টি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে বলেও জানিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানান, রাজধানীতেই অন্তত দুইজন নিহত ও ৫৬ জন আহত হয়েছেন। শহরের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে। একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর সেখানে আগুন ধরে যায়। অন্যদিকে একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্রে হামলার পর বহু মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আটকা পড়েন।
কিয়েভের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আশপাশের এলাকায় আরও দুইজন নিহত ও নয়জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া চেরকাসি অঞ্চলে ১১ জন এবং দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে সাতজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
রাশিয়ার ব্যবহৃত ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এর আগে বলেছিলেন, ‘ওরেসনিক’ শব্দের অর্থ ‘হেজেলনাট গাছ’। তাঁর দাবি, এই ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির প্রায় ১০ গুণ দ্রুতগতিতে ছুটতে পারে এবং মাটির গভীরে থাকা শক্তিশালী বাংকারও ধ্বংস করতে সক্ষম।
পুতিন আরও দাবি করেছিলেন, এই অস্ত্র যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে পারে এবং একাধিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। এমনকি প্রচলিত ওয়ারহেড দিয়েও একাধিক ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা পারমাণবিক হামলার মতো ধ্বংসাত্মক হতে পারে বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
ইউক্রেনে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এমানুয়েল মাখোঁ। তিনি রাশিয়ার এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য এটিকে গভীর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরে প্রথমবারের মতো ‘ওরেসনিক’ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় লভিভ অঞ্চলেও একই ধরনের হামলার দাবি করা হয়।
রাশিয়া জানিয়েছে, এই হামলা ছিল ইউক্রেনের সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার প্রতিশোধ। গত বৃহস্পতিবার রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত পূর্ব ইউক্রেনের স্টারোবিলস্ক শহরের একটি কলেজ ছাত্রাবাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও ৪২ জন আহত হন বলে মস্কো দাবি করেছে। নিহতদের বেশিরভাগই তরুণী ছিলেন বলে জানানো হয়।
ওই ঘটনার পর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “অনিবার্য ও কঠোর জবাবের” হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। একই সময় কিয়েভে অবস্থানরত মার্কিন দূতাবাসও বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে রাশিয়া প্রায় প্রতিদিনই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রোববারের এই হামলা ছিল যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ রাতগুলোর একটি।
ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাজারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা ৫৫ বছর বয়সী বাসিন্দা সভেতলানা ওনোফ্রিচুক বলেন, “এটি ছিল এক ভয়ানক রাত। পুরো যুদ্ধকালেও এমন কিছু দেখিনি।” তিনি জানান, তাঁর কর্মস্থল পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এখন তাঁকে কিয়েভ ছাড়তে বাধ্য হতে হচ্ছে।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ৭৪ বছর বয়সী ইয়েভহেন জোসিন বলেন, বিস্ফোরণের ধাক্কায় তাঁরা ছিটকে পড়েছিলেন। যদিও প্রাণে বেঁচে গেছেন, তবে তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার সত্য হলে তা যুদ্ধের নতুন ও আরও বিপজ্জনক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। এতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও আরও বড় হুমকিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।