প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনেই মানবিক ও জনমুখী রাজনীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাঁর দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট ও দুঃশাসনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে দেশ এখন গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের ক্ষমতায়নের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
আজ সোমবার বিকেল তিনটায় প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়–এর ‘করবী’ হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সরকারের ‘১০০ দিন পূর্তি’ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
মাহদী আমিন বলেন, রক্তস্নাত জুলাই গণ–অভ্যুত্থান এবং ১৬ বছরের ত্যাগ-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় গঠিত সরকার জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। তিনি দাবি করেন, সরকারের দৃশ্যমান পদক্ষেপের ফলে মানুষের জীবনমান ও রাষ্ট্রীয় সেবার কাঠামোয় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অগ্রাধিকারভিত্তিক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে বিষয়ভিত্তিক ও খাতভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা থেকে কৃষি—বিভিন্ন খাতে উদ্যোগ
সরকারের বিভিন্ন খাতভিত্তিক কার্যক্রম তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে নেওয়া উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে নারীকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী চালুর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
কৃষিখাতে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে মুখপাত্র বলেন, ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচারব্যবস্থা
মাহদী আমিন দাবি করেন, সরকার গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জন্য সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তবে বাক্স্বাধীনতার নামে অপপ্রচার, বিদ্বেষ ও বিষোদ্গারমূলক রাজনীতি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠকে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বাকিগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ঈদযাত্রা, শ্রমিক বেতন ও পশুর হাট ব্যবস্থাপনা
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকারের প্রস্তুতির বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, শ্রমিকদের ঈদের আগে বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করতে সরকার ব্যাংক, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ ট্রেন ও বিশেষ নৌ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। নারীদের নিরাপদ ভ্রমণের জন্য ট্রেনে আলাদা কম্পার্টমেন্ট এবং ঈদের সাত দিন আগে থেকে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠনের কথাও জানান তিনি।
এ ছাড়া কোরবানির পশুর বর্জ্য আট ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ, চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মুখপাত্র।
অবকাঠামো ও প্রযুক্তিখাতে অগ্রগতি
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ইকোনমিক করিডর বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর–এর থার্ড টার্মিনালের উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ এগিয়ে চলছে।
তিনি আরও জানান, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা সম্প্রসারণ, বিমানবন্দর ও ট্রেনে হাইস্পিড ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু এবং তরুণদের জন্য ‘স্পোর্টস’ ও ‘নতুন কুঁড়ি’ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও বিচারব্যবস্থায় উদ্যোগ
স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, হামের টিকা এনে প্রায় শতভাগ শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি এবং পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পল্লবীতে শিশু হত্যা এবং মেহেরপুরে শিশু ধর্ষণের দুটি আলোচিত ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সরকার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। পল্লবীর ঘটনায় ইতিমধ্যে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং মেহেরপুরে ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত বিচারের ক্ষেত্রে একটি বিরল নজির বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থনীতি, রেমিট্যান্স ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত
মাহদী আমিন বলেন, এস আলম গ্রুপ–এর ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
তিনি জানান, গত মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে এবং প্রবাসীদের পাঠানো মাসিক রেমিট্যান্স প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এ ছাড়া প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাহদী আমিন আরও বলেন, প্রায় দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, এখন জনগণ শুধু প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাচ্ছেন না; বরং প্রধানমন্ত্রী নিজেই মানুষের দুয়ারে পৌঁছে তাঁদের কথা শুনছেন এবং দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে মাহদী আমিন পবিত্র ঈদুল আজহার অগ্রিম শুভেচ্ছা জানান। লিখিত বক্তব্য শেষে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি, মোস্তফা জুলফিকার হাসান, মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এবং শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীনসহ প্রেস উইংয়ের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।