তথ্যসূত্র: ফক্স নিউজ
জন্মসূত্রে সন্তানের মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ বা এ ধরনের ভ্রমণে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে নতুন ভিসা বিধিনিষেধ নীতি ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন। বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার এ নীতির ঘোষণা দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন বিধিনিষেধের আওতায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণকারীরাই নয়, বরং এ ধরনের ভ্রমণ আয়োজন, পরিচালনা, প্রচার বা সহায়তার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও পড়বেন।
রুবিও বলেন, বাণিজ্যিক বার্থ ট্যুরিজম নেটওয়ার্কগুলো মুনাফার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার ব্যবস্থা করে আসছে। এসব নেটওয়ার্ক ভিসা আবেদনকারীদের তথ্য গোপন বা মিথ্যা তথ্য দেওয়ার কৌশল শেখায় এবং যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্মদানের ব্যবস্থা করে অর্থ নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নতুন নীতিতে কারা পড়বেন
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন ভিসা বিধিনিষেধ এমন বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছে, যারা জেনেশুনে বার্থ ট্যুরিজমে যুক্ত হন, আগে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন অথবা অন্যদের এ কাজে সহায়তা করেন।
এর মধ্যে বাণিজ্যিক বার্থ ট্যুরিজম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক, পরিচালক ও ব্যবস্থাপক রয়েছেন। এ ছাড়া ভিসা ‘ফিক্সার’ বা দালালদেরও নীতির আওতায় আনা হতে পারে। এসব ব্যক্তি ভিসা আবেদনকারীদের মিথ্যা তথ্য দেওয়া কিংবা অভিবাসন কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করার কৌশল শেখান বলে মার্কিন সরকারের অভিযোগ।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহায়তাকারী বিদেশি চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধেও ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা জেনেশুনে বার্থ ট্যুরিজমে সহায়তা করেন এবং মার্কিন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা বা মেডিকেড ব্যবস্থার অপব্যবহারে সহযোগিতা করেন, তাঁদেরও লক্ষ্য করা হবে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর।
এ ছাড়া বাণিজ্যিক বার্থ ট্যুরিজমকে সমর্থন, সহায়তা বা পরিচালনায় সক্ষম করে এমন অন্যান্য ব্যক্তিও বিধিনিষেধের আওতায় আসতে পারেন।
বার্থ ট্যুরিজম কী
‘বার্থ ট্যুরিজম’ বলতে সাধারণত এমন আন্তর্জাতিক ভ্রমণকে বোঝানো হয়, যার মূল উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া এবং এর মাধ্যমে শিশুর জন্য মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সন্তানের জন্য মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া ভিজিটর ভিসায় অনুমোদিত ভ্রমণের উদ্দেশ্য নয়। অর্থাৎ পর্যটন বা চিকিৎসার মতো বৈধ ভ্রমণের উদ্দেশ্যের আড়ালে মূল লক্ষ্য যদি যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে নাগরিকত্ব পাওয়াই হয়, তাহলে সেটি ভিজিটর ভিসার অনুমোদিত ব্যবহারের মধ্যে পড়ে না।
নতুন নীতি এই বিদ্যমান অবস্থানকে আরও কঠোরভাবে প্রয়োগের একটি পদক্ষেপ হিসেবে এসেছে। এর লক্ষ্য শুধু ভ্রমণকারীদের ওপর নজর দেওয়া নয়; বরং এ ধরনের ভ্রমণকে বাণিজ্যিকভাবে সংগঠিত করে এমন নেটওয়ার্কের ওপরও চাপ তৈরি করা।
ভিসা আবেদনে মিথ্যা তথ্যের অভিযোগ
রুবিওর ঘোষণায় বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক বার্থ ট্যুরিজম নেটওয়ার্কগুলো বিদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার জন্য আবেদনপত্রে মিথ্যা তথ্য দিতে উদ্বুদ্ধ বা পরামর্শ দেয়।
এ ধরনের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আবেদনকারীরা নিজেদের ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করতে পারেন বলে মার্কিন সরকারের অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ব্যবস্থায় আবেদনকারীর ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং ভিসার শর্ত মেনে চলার অভিপ্রায় যাচাই করা হয়।
ফলে নতুন বিধিনিষেধের আওতায় শুধু বার্থ ট্যুরিজমে সরাসরি অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিই নয়, ভিসা জালিয়াতিতে সহযোগিতা করা মধ্যস্থতাকারীরাও পড়তে পারেন।
১০ হাজার ডলার পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক বার্থ ট্যুরিজম নেটওয়ার্কগুলো যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্মদানের ব্যবস্থা করে বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেয়। রুবিওর ঘোষণায় এমন ব্যবস্থার জন্য প্রায় ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ব্যবসায়িক মডেলের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের প্রধান অভিযোগ হলো—এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনব্যবস্থাকে ব্যবহার করে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগকে বাণিজ্যিক সেবায় পরিণত করেছে।
ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে রুবিওর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এমন ব্যক্তিদের ভিসা সীমিত করতে চায়, যারা এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে লাভবান হন বা অন্যদের এতে সহায়তা করেন।
আইনি ভিত্তি কোনটি
নতুন ভিসা বিধিনিষেধটি যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের ২১২(এ)(৩)(সি) ধারা ব্যবহার করে কার্যকর করার কথা জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকানো এবং মার্কিন নাগরিকত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে প্রশাসন বিদ্যমান আইনি ক্ষমতার আওতায় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এর আগে থেকেই জানিয়েছে, ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর যোগ্যতা, ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর ভিসার শর্ত মেনে চলার অভিপ্রায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভিসা পাওয়ার অধিকার স্বয়ংক্রিয় নয়; আবেদন যাচাই করে মার্কিন সরকার ভিসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
পরিবারের সদস্যরাও কি বিধিনিষেধে পড়তে পারেন
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নীতির আওতায় কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট পরিবারের সদস্যরাও ভিসা বিধিনিষেধের মুখে পড়তে পারেন।
এর অর্থ হলো, নীতিটি শুধু কোনো একটি বার্থ ট্যুরিজম ব্যবসার মালিক বা পরিচালকের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও ভিসা ইস্যু সীমিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে কার ক্ষেত্রে কোন ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর হবে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর্মকাণ্ড, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আইনের প্রযোজ্য ধারা এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের পৃথক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
নাগরিকত্বের প্রশ্নে বড় বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত বিধানকে ঘিরে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রশ্নটি দেশটির অভিবাসন বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসনব্যবস্থায় কঠোরতা বাড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপের অংশ হিসেবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টিও সামনে এনেছে। তবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রশ্ন এবং বার্থ ট্যুরিজম ঠেকাতে ভিসা নীতির প্রয়োগ—দুটি বিষয় আলাদা।
নতুন ভিসা বিধিনিষেধ মূলত বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় ভিসার উদ্দেশ্য ও অপব্যবহারের বিষয়টি কেন্দ্র করে। এটি নিজে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর নাগরিকত্বের সাংবিধানিক অবস্থান পরিবর্তন করে না।
বাংলাদেশসহ বিদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য কী অর্থ
নতুন নীতিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে ঘোষণা করা হয়নি। ফলে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য আলাদা কোনো নিষেধাজ্ঞার কথা এতে বলা হয়নি।
তবে বাংলাদেশসহ যেকোনো দেশের নাগরিক যদি ভিজিটর ভিসা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করেন এবং বার্থ ট্যুরিজমে যুক্ত থাকেন, তাহলে নতুন নীতির পাশাপাশি বিদ্যমান ভিসা ও অভিবাসন আইনও প্রযোজ্য হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বর্তমান নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে শিশুর নাগরিকত্ব পাওয়াই যদি ভ্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সেটি ভিজিটর ভিসায় অনুমোদিত উদ্দেশ্য নয়।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ভিসা যাচাই ও নিরাপত্তা পরীক্ষার পরিধি বাড়িয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সর্বশেষ ঘোষণায় আরও কয়েকটি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা শ্রেণির আবেদনকারীদের অনলাইন উপস্থিতি যাচাইয়ের আওতায় আনার কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর।
কেন এখন এই পদক্ষেপ
ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগে বিদেশিদের যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করার ওপর জোর দিচ্ছে। সেই বৃহত্তর নীতির অংশ হিসেবেই বার্থ ট্যুরিজমকে লক্ষ্য করে নতুন ভিসা বিধিনিষেধ আনা হয়েছে।
রুবিওর বক্তব্য অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্য হলো এমন একটি বার্তা দেওয়া যে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনব্যবস্থা ব্যবহার করে ব্যবসা করা এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে ভিসার শর্ত এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, মার্কিন নাগরিকত্বের মর্যাদা রক্ষা, সরকারি জনকল্যাণমূলক সুবিধার অপব্যবহার থেকে জনগণ ও করদাতাদের সুরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ভিসা ব্যবস্থার বিদ্যমান ক্ষমতাগুলো ব্যবহার করছে।
সামনে কী হতে পারে
নতুন নীতির ফলে বার্থ ট্যুরিজমের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ব্যক্তিদের ভিসা আবেদন আরও কঠোরভাবে যাচাই হতে পারে। বিশেষ করে ভিসা আবেদনে তথ্য গোপন, মিথ্যা তথ্য প্রদান, ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার কিংবা বাণিজ্যিকভাবে বার্থ ট্যুরিজম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ থাকলে ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে নতুন নীতির আওতায় পড়া মানেই সব ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন নয়। প্রতিটি আবেদন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিস্থিতি মার্কিন অভিবাসন ও ভিসা আইনের অধীনে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক বিধান সরাসরি পরিবর্তন করা নয়; বরং সেই নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ এবং এ ধরনের ভ্রমণকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ভিসা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা। নতুন নীতির মাধ্যমে ওয়াশিংটন বার্থ ট্যুরিজমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও মধ্যস্থতাকারীদের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি ঝুঁকির মুখে ফেলছে।