ঢাকা

ইরান নীতিতে সমালোচনার মুখে ট্রাম্প, আলোচনায় কিউবা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন দৃষ্টি ঘুরিয়েছেন কিউবা–র দিকে—এমন বিশ্লেষণ উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন–এর এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ইস্যুতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপে থাকা ট্রাম্প প্রশাসন এখন কিউবাকে কেন্দ্র করে নতুন এক পররাষ্ট্রনৈতিক ‘বিজয়’ অর্জনের চেষ্টা করছে।

সিএনএনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক স্টিফেন কলিনসন তাঁর বিশ্লেষণে লিখেছেন, ইরানে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন এখন কিউবায় শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুঁজছে। তবে এমন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মামলা, নতুন উত্তেজনার সূচনা

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো–কে হত্যাকাণ্ড ও মার্কিন নাগরিকদের হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। ঘটনাটি ঘটে কিউবার স্বাধীনতা দিবসের দিন, যা দুই দেশের সম্পর্কের উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

মামলাটি ১৯৯৬ সালে দুটি বেসামরিক উড়োজাহাজ ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ওই ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে তিনজন ছিলেন মার্কিন নাগরিক।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে কিউবার ওপর চাপ বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য সামরিক বা কূটনৈতিক অভিযানের জন্য একটি রাজনৈতিক ভিত্তিও তৈরি করছে।

‘কিউবাকে মুক্ত করছি’—ট্রাম্পের হুমকি

গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্প প্রকাশ্যে কিউবাকে নিয়ে একের পর এক কঠোর মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, দরিদ্র এই দেশটির সঙ্গে তিনি “যা খুশি তাই করতে পারেন” এবং কিউবা “দখল করার গৌরব” তাঁর হতে পারে।

সবশেষ বুধবার ট্রাম্প বলেন, তিনি কিউবাকে “মুক্ত করছেন”।

এমন বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন জ্বালানি তেলের ওপর মার্কিন অবরোধের কারণে কিউবায় তীব্র অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটির সমাজব্যবস্থা ও অর্থনীতি গভীর চাপের মুখে রয়েছে।

একই সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ–এর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ হাভানার কাছে একাধিক দাবি উত্থাপন করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ইরান, ভেনেজুয়েলা ও কিউবা—একই কৌশল?

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে যে কৌশল অনুসরণ করছে, তা হলো—অর্থনৈতিক অবরোধ, কূটনৈতিক চাপ এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকির সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।

এই কৌশল আগে ভেনেজুয়েলা–তেও ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে ইরান–এর ক্ষেত্রে সেটি কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি বলে মনে করা হচ্ছে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট–এর গবেষক লি শ্লেনকা সতর্ক করে বলেছেন, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মামলা কিউবার জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ঐক্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাঁর মতে, এতে কিউবার নেতৃত্ব আরও কঠোর অবস্থানে চলে যেতে পারে।

লি শ্লেনকা বলেন, “কিউবার কাছ থেকে ছাড় আদায়ের উদ্দেশ্যে এই চাপ প্রয়োগ করা হলে তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।”

সামরিক ঝুঁকি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলা ও ইরানে সামরিক পদক্ষেপের আগে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিউবার ক্ষেত্রে এখনো তেমন প্রস্তুতির সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা না গেলেও কিউবা উপকূলে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা উড়োজাহাজের তৎপরতা বেড়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, কিউবায় সামরিক অভিযান চালানো ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হবে। কারণ, কিউবার সামরিক সক্ষমতা সীমিত হলেও দেশটির প্রতিরক্ষা নীতিতে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের ধারণা রয়েছে।

লি শ্লেনকা বলেন, বিদেশি আগ্রাসনের মুখে কিউবার পুরো জনগণ প্রতিরোধে অংশ নেয়। ফলে যেকোনো মার্কিন হামলায় মার্কিন সেনাদের হতাহতের আশঙ্কা থাকবে। কিন্তু তাতেও কিউবা সরকারের পতন নিশ্চিত নয়।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধাক্কা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বর্তমানে তলানিতে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন। অনেকেই ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে দেশের অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন।

জরিপ অনুযায়ী, বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের কিউবা নীতির প্রতিও সমর্থন দিচ্ছেন না।

তবে ফ্লোরিডা–র কিউবান অভিবাসী ও কমিউনিস্টবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান জনপ্রিয় হতে পারে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কোনো সংঘাত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় রাজনৈতিক চাপও তৈরি করতে পারে।

‘ঐতিহাসিক স্বীকৃতি’ পাওয়ার চেষ্টা?

বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প হয়তো এমন একটি পররাষ্ট্রনৈতিক সাফল্য খুঁজছেন, যা তাঁর প্রশাসনের দুর্বল হয়ে পড়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।

ইরান যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থতা, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে অগ্রগতি না থাকা এবং গাজা যুদ্ধবিরতি উদ্যোগ থমকে যাওয়ার কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি চাপে রয়েছে।

এ ছাড়া কিউবার প্রয়াত নেতা ফিদেল কাস্ত্রো–এর শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিতে অতীতের কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট সফল হননি। ফলে কিউবায় পরিবর্তন আনতে পারলে তা ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশেষ করে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবান অভিবাসী পরিবারের সন্তান হওয়ায় কিউবা ইস্যু তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

কিউবার জনগণের বাস্তবতা

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কিউবার বর্তমান সরকার দীর্ঘদিন ধরে দমনমূলক শাসন চালিয়ে আসছে—এ নিয়ে বিতর্ক কম। তবে একই সঙ্গে মার্কিন অবরোধ দেশটির সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বাড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিউবা ও ইরান—দুই দেশেই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধ সত্ত্বেও শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি ইতিহাসে নিজের নাম লেখাতে চান, তাহলে তাঁকে যে মূল্য দিতে হতে পারে, তা রাজনৈতিক ও মানবিক—দুই দিক থেকেই অত্যন্ত ব্যয়বহুল হতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স