বাসস, ঢাকা
সবার সম্মিলিত সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকলে সরকার একটি ‘কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের মানুষ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা যেভাবে বাংলাদেশকে দেখতে চান, সরকার ধাপে ধাপে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
পবিত্র ঈদুল আজহার দিন বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে অফিসার ও সৈনিকদের সম্মানে আয়োজিত এক প্রীতিভোজ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘মৃত্যুঞ্জয়ী পঁচিশ’ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট জিয়া কলোনিতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সৈনিকসহ দেশের সাধারণ মানুষ দেশকে যেভাবে কল্পনা করে, সরকার চেষ্টা করছে পর্যায়ক্রমে দেশটাকে সেভাবেই গড়ে তুলতে। আমি বহু বছর দেশে থাকতে পারিনি। কেন পারিনি সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। কারণ, সে সময় দেশে ভালো-মন্দ কী হয়েছে, তা নিয়ে সবারই কমবেশি ধারণা আছে। কিন্তু এখন আমরা দেশকে ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে চাই।”
দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্ব
দেশ গঠনে সবার দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি।
তিনি বলেন, “আমাদের সবারই নির্দিষ্ট কর্তব্য আছে। আমরা যদি যার যার অবস্থান থেকে সঠিকভাবে সেগুলো পালন করি, তবে অবশ্যই আমাদের কাঙ্ক্ষিত দেশটি গড়ে তুলতে সক্ষম হব।”
ঈদের দিনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের তৌফিক দান করেন। একই সঙ্গে আমরা যেন সারা দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখতে পারি এবং প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি।”
সেনানিবাসে শৈশবের স্মৃতিচারণ
বক্তৃতার একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা সেনানিবাসে কাটানো তাঁর শৈশবের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সেনানিবাস এলাকায় প্রবেশের পর তাঁর মনে হয়েছে যেন তিনি ৪৫-৪৬ বছর পেছনে ফিরে গেছেন।
তারেক রহমান বলেন, “১৯৭৫/৭৬ কিংবা ৭৭ সালের কথা হবে। সিএমএইচের গেটটা তখন এত বড় ছিল না। গাড়িতে থাকা এডিসিকে জিজ্ঞেস করছিলাম—সিএমএইচে ঢোকার পরে ছোট একটা প্যাথোলজি ছিল, সামনে বাগানের মতো জায়গা ও কয়েকটি সিমেন্টের বেঞ্চ ছিল, সেগুলো এখনো আছে কি না।”
তিনি আরও বলেন, “একদম সোজা গেলে হাতের বাঁ দিকে ছিল ফ্যামিলি ওয়ার্ড, ডান দিকে স্টাফ সার্জনের কক্ষ। তখন টিনের ঘরে স্টাফ সার্জন বসতেন। আমার জ্বর হলে একাই সেখানে চলে যেতাম। এখনো মনে আছে, তখন স্টাফ সার্জন ছিলেন মেজর আনোয়ার।”
প্রধানমন্ত্রী জানান, ছোটবেলায় বন্ধুদের নিয়ে প্রতিদিন বিকেলে সাইকেল চালিয়ে সেনানিবাসের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতেন। শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে বের হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মসজিদের সামনে পর্যন্ত যাওয়ার স্মৃতিও তিনি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “সেই মসজিদটা এখন আরও অনেক সুন্দর হয়েছে। তখন পুরোপুরি সাদা চুনকাম করা ছিল।”
‘এই এলাকার সঙ্গে আমার জীবনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে’
সেনানিবাস এলাকার পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এখনকার সুসজ্জিত ও আধুনিক পরিবেশ একসময় এমন ছিল না।
“আমরা যেখানে বসে আছি, একসময় এখানে জঙ্গলের মতো পরিবেশ ছিল। রাস্তা ছিল অনেক সরু। আজ এমন একটি স্থানে এসেছি, যেখানে আমার জীবনের বিরাট একটা অংশ জড়িয়ে আছে। আমার ভালো-মন্দ, কষ্ট-ব্যথা, সুখ-দুঃখের বিশাল স্মৃতি এই পুরো এলাকায় মিশে আছে,” বলেন তিনি।
ঈদের আনন্দের দিনে সেনাসদস্যদের সঙ্গে স্মৃতিচারণের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই এলাকায় এলে তাঁর মধ্যে বিশেষ এক অনুভূতি কাজ করে, কারণ ছোটবেলা থেকে তিনি এখানে বেড়ে উঠেছেন।
তিনি আরও বলেন, “সৈনিকদের ব্যারাকের ভেতরে ঘুরে বেড়াতাম, তাদের সঙ্গে কথা বলতাম।”
সেনাসদস্যদের আত্মত্যাগের প্রশংসা
সেনাবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রয়োজনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সেনাসদস্য এবার ঈদে পরিবারের কাছে যেতে পারেননি। তাঁদের এই আত্মত্যাগের জন্য সরকার ও জাতি কৃতজ্ঞ থাকবে।
তিনি বলেন, “স্বাভাবিকভাবে ঈদের সময় মানুষ পরিবারের সঙ্গে থাকতে চায়। কিন্তু দেশের দায়িত্ব পালনের জন্য অনেকেই ছুটিতে যেতে পারেননি। আপনাদের এই স্যাক্রিফাইসের জন্য আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই।”
তারেক রহমান বলেন, “দেশ এবং জাতি আপনাদের এই আত্মত্যাগ অবশ্যই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।”
সাংবাদিক উদ্ধার অভিযানের প্রশংসা
সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক এক উদ্ধার অভিযানের প্রশংসাও করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগে দুটি পত্রিকা কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সেনাসদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে প্রায় ১৮ জন সাংবাদিককে উদ্ধার করেছিলেন।
তিনি বলেন, “এই ঘটনাটি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার এবং এটি আপনাদের পেশাদারিত্ব ও মানবিক দায়িত্ববোধের বড় উদাহরণ।”
‘দেশকে ভালো অবস্থানে দেখতে চাই’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রয়োজনে সৈনিকেরা জীবন উৎসর্গ করেন। সেই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, “দেশের এবং দেশের মানুষের প্রয়োজনে সৈনিকেরা জীবন দেয়। আর আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সেই আত্মত্যাগের মূল্যায়ন করা। তার প্রথম শর্ত হলো—নিজ দেশের কথা সবার আগে ভাবা।”
সমাজের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মানুষ চায় তাদের সন্তানরা যেন ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারে, পরিবার যেন সুচিকিৎসা পায় এবং সবাই নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারে। সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর অফিসার, সৈনিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
পরে তিনি ‘পঁচিশ মৃত্যুঞ্জয়ী’ ভবনের সামনে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন।