ঢাকা

নানামুখী চাপের পরও রাশিয়ার নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য পুতিন (এএফপি, ওয়ারশ)

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
এএফপি, ওয়ারশ

ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও রাশিয়ার ভেতরে ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনব্যবস্থা এখনো দৃঢ় অবস্থানেই রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধের চাপ এখন রুশ সমাজ, অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।

ইন্টারনেট–বিভ্রাট, অর্থনৈতিক সংকোচন, যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতির স্থবিরতা এবং জনসমর্থনের পতন—সব মিলিয়ে মস্কোর সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তবু বিশ্লেষকদের মতে, এসব চাপ সত্ত্বেও পুতিনের ক্ষমতার ভিত্তি এখনো অটুট।

যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া রাশিয়ার অভ্যন্তরে

২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর থেকেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা রাশিয়ার অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চাপ এখন অভ্যন্তরীণ জীবনে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা প্রতিরোধে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত ইন্টারনেট–বিভ্রাট চালু করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা জনঅসন্তোষ বাড়াচ্ছে।

অন্যদিকে উচ্চ সামরিক ব্যয় ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে রাশিয়ার অর্থনীতি সংকোচনের দিকে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি কিছু খাতে উৎপাদনও স্থবির হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি থমকে গেছে

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম দিকে ইউক্রেনে যে গতিতে অগ্রগতি আশা করা হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই থেমে গেছে। বিপুল সংখ্যক সেনা হতাহত হওয়ার পাশাপাশি দনবাসসহ গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের তথ্য বিশ্লেষণ করে এএফপি জানিয়েছে, ২০২৩ সালের পর প্রথমবারের মতো রাশিয়া ইউক্রেনে যতটা ভূখণ্ড দখল করেছে, তার চেয়ে বেশি হারিয়েছে।

এই পরিস্থিতি রুশ সামরিক নেতৃত্বের জন্য কৌশলগত চাপ তৈরি করেছে এবং যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

জনসমর্থন কমলেও পুতিনের নিয়ন্ত্রণ অটুট

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে বলে স্বাধীন জরিপে দেখা গেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাঁর জনসমর্থন ২০২২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।

তবু বিশ্লেষকদের মতে, এই পতন সত্ত্বেও রাশিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো এখনো সম্পূর্ণভাবে পুতিন-কেন্দ্রিক।

রুশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কনস্তান্তিন কালাচেভ বলেন, জনসমর্থন কমছে এবং মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, তবে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি।

তিনি বলেন, “এখনো কোনো সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।”

অসন্তোষ থাকলেও নেই সংগঠিত প্রতিরোধ

ইন্টারনেট–বিভ্রাট ও অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়লেও তা এখনো বড় ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়নি। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভিন্নমত দমননীতির কারণে রাশিয়ায় সংগঠিত প্রতিবাদের সুযোগ সীমিত।

অনেক নাগরিক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এড়াতে ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করছেন, তবে সেটিও কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে রুশ সমাজ এক ধরনের “অভ্যস্ততার বাস্তবতায়” চলে গেছে, যেখানে নাগরিকরা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

অর্থনীতি ও অভিজাতদের মধ্যে চাপ

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার অর্থনীতি প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিক সংকোচনের মুখে পড়েছে বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধকালীন ব্যয় মেটাতে কর বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ের পুনর্বিন্যাসের ফলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষও বাড়ছে।

লাটভিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ব্যবসায়ী ও প্রশাসনিক অভিজাতদের মধ্যেও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

তবে একই প্রতিবেদনে এটিও উল্লেখ করা হয় যে, পুতিনের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ তৈরি করার মতো সংগঠিত নেতৃত্ব বা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি এখনো দৃশ্যমান নয়।

ক্ষমতার কাঠামো এখনো শক্তিশালী

২০২৩ সালে ভাড়াটে বাহিনী ভাগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিনের বিদ্রোহ রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের ধাক্কা দিলেও পরবর্তীতে পুতিন সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার পর থেকে রাশিয়ার নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কালাচেভ বলেন, “একটি সংকট তৈরি হতে হলে দরকার একটি উদ্দীপক ঘটনা এবং একটি বিকল্প নেতৃত্ব। এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই তৈরি হয়নি।”

‘স্থিতিশীল কিন্তু চাপের মধ্যে’ রাশিয়া

প্যারিসভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ইনস্টিটিউট মনতেঁনের বিশেষজ্ঞ মিশেল দুকলো বলেন, রুশ অর্থনীতি এখন ধীরগতিতে স্থবিরতার দিকে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগজনক।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, রাশিয়াকে দুর্বল ধরে নেওয়া ভুল হবে। সামরিক সক্ষমতা, জ্বালানি সম্পদ এবং কূটনৈতিক অবস্থান—সব ক্ষেত্রেই মস্কো এখনো শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি রাশিয়ার জন্য “অস্থির কিন্তু নিয়ন্ত্রিত চাপের” সময়। অর্থনীতি ও সমাজে চাপ বাড়লেও ক্ষমতার কেন্দ্রে এখনো দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছেন ভ্লাদিমির পুতিন, এবং নিকট ভবিষ্যতে সেই ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা সীমিত বলেই মনে করা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স