জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান মামলায় পুলিশ কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, তা দেখার পর তাঁর সংসদ সদস্য পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার তিনি প্রথম আলোকে এ কথা জানান।
স্পিকার বলেন, শুধু কোনো রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার করার কারণে একজন সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হয় না। গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি জানিয়ে জামায়াতে ইসলামী স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে। তবে ওই চিঠির ভিত্তিতে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হয়েছে। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের তদন্ত ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের ওপরই এখন সংসদ সদস্য পদ নিয়ে পরবর্তী প্রক্রিয়া নির্ভর করছে বলে স্পিকারের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
দল থেকে বহিষ্কার, কিন্তু এমপি পদ বহাল
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ২২ জুলাই তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। পরে দলটির পক্ষ থেকে বিষয়টি স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
তবে দল থেকে বহিষ্কারের পরও গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল রয়েছে।
এ বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো সংসদ সদস্যকে তাঁর রাজনৈতিক দল বহিষ্কার করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয় না। সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, দল থেকে বহিষ্কার এবং নিজে দল থেকে পদত্যাগ করা এক বিষয় নয়।
স্পিকারের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নিজে দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্তে কাউকে বহিষ্কার করার বিষয়টি একইভাবে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার কারণ নয়।
দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুতে নতুন করে আলোচনায়
এর মধ্যে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) মৃত্যু ঘটনাটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। গত রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মরিয়মের বাবা একটি মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
মামলায় গ্রেপ্তারের পর গাজী নজরুল ইসলামকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকেও এক দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। পুলিশ তদন্ত করছে এবং মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপরই ঘটনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
পুলিশের পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে স্পিকার
গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে এখন কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে—এ বিষয়ে স্পিকার বলেন, তাঁরা পুলিশের পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন।
তিনি জানান, পুলিশ এ মামলায় কী ব্যবস্থা নেয়, তা দেখার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পুলিশি কার্যক্রমের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হতে পারে। এরপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে স্পিকার একই সঙ্গে আদালতের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মামলাটি আদালতের পর্যায়ে গিয়ে এ বিষয়ে আদালতও কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
অর্থাৎ গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি মামলার তদন্ত, পুলিশের পদক্ষেপ এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে কী বলা আছে
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং পদে থাকার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়ে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বিধান রয়েছে।
এই অনুচ্ছেদের অন্যতম বিধান হলো, কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে, এবং তাঁর মুক্তির পর পাঁচ বছর সময় অতিবাহিত না হলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বা সংসদ সদস্য পদে থাকার অযোগ্য হবেন।
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু কোনো ফৌজদারি মামলায় আসামি হওয়া বা গ্রেপ্তার হওয়াই সংসদ সদস্য পদ হারানোর সমার্থক নয়। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের সংশ্লিষ্ট বিধানের ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হয়ে নির্দিষ্ট মেয়াদের সাজা হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা ও তদন্ত চললেও তাঁর সংসদ সদস্য পদ নিয়ে সাংবিধানিক অযোগ্যতার প্রশ্নটি চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের ক্ষেত্রে মামলার পরবর্তী ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিতর্ক হলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছনে আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ওই অনুচ্ছেদের অধীনে অযোগ্য হয়েছেন কি না, অথবা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে কি না—এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে প্রশ্নটি শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে।
এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে।
এই সাংবিধানিক বিধানের কারণেই গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন উঠলে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। স্পিকারের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশের পদক্ষেপ দেখার পর প্রয়োজন হলে নির্বাচন কমিশনের কাছে বিষয়টি পাঠানো হতে পারে।
৭০ অনুচ্ছেদে দলত্যাগ ও দলের বিরুদ্ধে ভোট
সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদও গুরুত্বপূর্ণ। এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে।
তবে কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর দল তাঁকে বহিষ্কার করলে তাঁর আসন শূন্য হবে কি না—এ বিষয়ে ৭০ অনুচ্ছেদে সরাসরি এমন কোনো বিধান নেই।
এ কারণেই গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের পর তাঁর সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকা নিয়ে সাংবিধানিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সংসদীয় কমিটি থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছিল
জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামকে সংসদীয় কমিটিতে না রাখার জন্য সরকারি দলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিল দলটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে দুটি সংসদীয় কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়।
তবে গত ৭ সেপ্টেম্বর সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটি পুনর্গঠনের সময় গাজী নজরুল ইসলামের নাম রাখা হয়েছিল। পরে জামায়াতে ইসলামীর আপত্তির পর তাঁর নাম বাদ দিয়ে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।
সেদিন সংসদে বিষয়টি নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্কও হয়।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, কোনো সংসদ সদস্যকে রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার করা হলে সংবিধান অনুযায়ী তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয় না। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য নিজে দল থেকে পদত্যাগ না করলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান প্রযোজ্য হয় না।
এখন সামনে পুলিশের তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া
গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে বর্তমানে দুটি বিষয় আলাদাভাবে সামনে রয়েছে। একদিকে, জামায়াতে ইসলামী থেকে তাঁর বহিষ্কারের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত; অন্যদিকে, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় করা ফৌজদারি মামলা।
দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি নিজে থেকেই তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল করছে না—স্পিকারের বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে, ফৌজদারি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফল ভবিষ্যতে সংসদ সদস্য পদে থাকার সাংবিধানিক যোগ্যতার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
তাই আপাতত গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে পুলিশের তদন্ত ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পুলিশের পদক্ষেপের পর প্রয়োজন হলে নির্বাচন কমিশনের কাছে বিষয়টি পাঠানো হবে; পাশাপাশি আদালতের সিদ্ধান্তও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।