ইউক্রেনজুড়ে ভয়াবহ রাতভর হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। সোমবার (২ জুন) দিবাগত রাতে রাজধানী কিয়েভ, দিনিপ্রোসহ অন্তত সাতটি অঞ্চলে চালানো এই সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ২২ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ।
রয়টার্সের বরাতে Reuters জানায়, এটি সাম্প্রতিক সময়ে অন্যতম বৃহৎ আকারের আক্রমণ, যেখানে একসঙ্গে শত শত ড্রোন ও বহু সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
রেকর্ডসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার
ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এক রাতেই রাশিয়া ৬৫৬টি ড্রোন এবং ৭৩টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর মধ্যে ৩৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৮টি ‘জিরকন’ (Zircon) হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যা অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র হিসেবে পরিচিত।
ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৬০২টি ড্রোন ভূপাতিত বা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হলেও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি।
কিয়েভ ও দিনিপ্রোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
রাজধানী কিয়েভের মেয়র জানিয়েছেন, হামলায় শহরটিতে অন্তত ৬ জন নিহত এবং ৩ শিশুসহ ৬০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
হামলায় অন্তত ৯টি বহুতল আবাসিক ভবন, একটি কিন্ডারগার্টেন, একটি বেসরকারি ক্লিনিক এবং একাধিক প্রশাসনিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলীয় শহর দিনিপ্রোতে ২ শিশুসহ অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। সেখানে একটি চারতলা আবাসিক ভবন আংশিকভাবে ধসে পড়ে, বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
হামলার পর কিয়েভের বড় অংশে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যার ফলে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ অন্ধকারে চলে যান। নিরাপত্তার কারণে হাজার হাজার বাসিন্দা মেট্রো স্টেশন ও ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেন।
জেলেনস্কির প্রতিক্রিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে একটি “স্পষ্ট বার্তা” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন কংগ্রেসের প্রতি জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের আহ্বান জানান।
জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সক্ষম না হয়, তাহলে রাশিয়ার এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকবে।
রাশিয়ার দাবি: “প্রতিশোধমূলক অভিযান”
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, এই হামলা ইউক্রেনের সাম্প্রতিক ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ জবাব। ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইউক্রেনীয় হামলার কারণে সংঘাত “নতুন মাত্রায়” প্রবেশ করেছে।
রুশ পক্ষ আরও দাবি করে, গত ২২ মে লুহানস্ক অঞ্চলে একটি ছাত্রাবাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় ২১ জন নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিক্রিয়াতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
তবে ইউক্রেনের দাবি, ওই এলাকায় তারা একটি ড্রোন কমান্ড সেন্টারে হামলা চালিয়েছিল, কোনো আবাসিক স্থাপনায় নয়।
পাল্টাপাল্টি হামলায় যুদ্ধ আরও তীব্র
চলমান যুদ্ধে উভয় পক্ষই একে অপরের ভেতরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরদার করেছে। একই রাতে ইউক্রেন রাশিয়ার ক্রাসনোদার অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালালে সেখানে আগুন লাগে।
রাশিয়া জানিয়েছে, তারা রাতারাতি ১৪৮টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চার বছরের কাছাকাছি সময় অতিক্রম করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতের দিকে বৈশ্বিক মনোযোগ স্থানান্তর হওয়ায় ইউক্রেন সংকট কূটনৈতিকভাবে আরও জটিল হয়ে উঠছে। এর ফলে উভয় পক্ষই সামরিক অভিযান বাড়াচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা
সাম্প্রতিক হামলা যুদ্ধকে আরও উচ্চমাত্রার সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় ইউক্রেনজুড়ে নতুন করে মানবিক সংকট গভীর হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী দিনে আরও বড় আকারের সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।