ঢাকা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক: সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে তেহরানের ভাবনা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো চুক্তির পথে এখনো সম্পূর্ণভাবে দরজা বন্ধ করেনি ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব। তবে দীর্ঘ যুদ্ধ, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং কঠোর শর্তের কারণে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনো স্থায়ী সমঝোতার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera–এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই পক্ষই আলোচনার টেবিল থেকে সরে যায়নি, তবে পরস্পরবিরোধী শর্ত ও আস্থার সংকট পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

তিন মাসের বেশি যুদ্ধ, সমঝোতার পথ অনিশ্চিত

যুদ্ধ শুরুর পর তিন মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এখনো হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

তেহরান এই প্রণালির ওপর নিজের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দাবি জানালেও ওয়াশিংটন ইরানের বন্দর ও কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর চাপ বজায় রেখেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অচলাবস্থা

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ভূগর্ভে সংরক্ষিত উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো স্পষ্ট সমঝোতা হয়নি।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টিও এখনো আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে, যা সম্ভাব্য চুক্তিকে আরও জটিল করে তুলছে।

পাল্টাপাল্টি হামলা ও যুদ্ধবিরতির অভিযোগ

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC)–এর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

তেহরানের অভিযোগ, এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘন করছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের ওপর আক্রমণাত্মক অবস্থান বজায় রাখার অভিযোগ তুলেছে।

অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিরাপত্তা গোষ্ঠী

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা গোষ্ঠীগুলো—বিশেষ করে আইআরজিসি—ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।

আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডাররা প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে কোনো নমনীয় অবস্থান নেননি। বরং তারা কঠোর প্রতিরোধমূলক অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে মত দিচ্ছেন।

আইআরজিসির কমান্ডাররা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনে সামরিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়েও কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন।

মোজতবা খামেনির ভূমিকা ও অবস্থান

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের নেতৃত্ব কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন মোজতবা খামেনি, যিনি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত।

তিনি পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে “জাতীয় সম্পদ” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত ভবিষ্যতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি এখনো প্রকাশ্যে খুব সীমিতভাবে উপস্থিত হচ্ছেন এবং তার বক্তব্যও মূলত লিখিত আকারে প্রকাশ করা হচ্ছে।

কট্টরপন্থী ও আলোচনাবিরোধী অবস্থান

ইরানের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও আইনপ্রণেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করেছেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সম্পদ ফেরত, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান ছাড়া কোনো চুক্তি সম্ভব নয়।

এদের মধ্যে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে “বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার নয়” বলে অভিহিত করেছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বিরোধিতা করছেন।

সীমিত আলোচনার সম্ভাবনা, কঠোর বাস্তবতা

তবে ইরানের সরকারপন্থী অংশ—যাদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা রয়েছেন—তারা এখনো আলোচনার মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতার পক্ষে মত দিচ্ছেন।

তাদের মতে, শর্তসাপেক্ষ আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমন এবং নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কৌশলগত জলপথ হরমুজ ও বৈশ্বিক উদ্বেগ

বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো বিপরীতমুখী। এই জলপথে নিয়ন্ত্রণ, ট্রানজিট ফি এবং সামরিক উপস্থিতি নিয়ে মতপার্থক্য আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে।

 আলোচনার দরজা খোলা, তবে পথ কঠিন

সামগ্রিকভাবে ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, সামরিক প্রভাব এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি এখনো অনেক দূরের বিষয়।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সময়ে উভয় পক্ষ কিছু আংশিক সমঝোতার দিকে এগোতে পারে, তবে স্থায়ী শান্তি বা বড় কোনো চুক্তির জন্য এখনো বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতি প্রয়োজন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স