ঢাকা

জাতিসংঘের সতর্কতা: এল নিনোতে বাড়তে পারে বৈশ্বিক জলবায়ু বিপর্যয়

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বৈশ্বিক জলবায়ুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়াবিন্যাস ‘এল নিনো’র নতুন ধাপ শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি ইতিমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তপ্ত হয়ে থাকা পৃথিবীর তাপমাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম BBC এবং Reuters–এর প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মধ্যে এই এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে “সুপার” পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কা: সতর্ক বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা

জাতিসংঘের অধীনস্থ World Meteorological Organization (ডব্লিউএমও) মঙ্গলবার জানায়, বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পরিবর্তন দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে এবং এর ফলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এল নিনো পরিস্থিতি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, ২০২৬ সালের পুরো সময়জুড়েই এই আবহাওয়াবিন্যাস আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং বিশ্বের বড় অংশজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াবে।

ডব্লিউএমও–র পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনো সাধারণত ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয় এবং এটি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতা থেকে সৃষ্টি হয়।

“সুপার এল নিনো”–র দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত

বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এবারের পরিস্থিতি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোতে রূপ নিতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞ একে সম্ভাব্য “সুপার এল নিনো” হিসেবেও উল্লেখ করছেন।

ডব্লিউএমও জানায়, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকতে পারে। পরিস্থিতি নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, “আমাদের এখনই সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর জন্য প্রস্তুত হতে হবে, যা খরা, ভারী বৃষ্টি এবং স্থল ও সমুদ্রে তাপপ্রবাহ আরও বাড়াবে।”

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি

সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে—

অস্ট্রেলিয়া, মধ্য আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে খরা দেখা দিতে পারে
দক্ষিণ ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় ও হারিকেনের ঝুঁকি বাড়তে পারে
দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, হর্ন অব আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার কিছু অংশে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে

বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার ধরণ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে বলে সতর্ক করেছে ডব্লিউএমও।

জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাড়তি ঝুঁকি

ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো আরও বলেন, তীব্র তাপপ্রবাহ ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এল নিনো সেই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়াতে পারে।

তিনি বলেন, এর ফলে—

তাপজনিত অসুস্থতা বাড়বে
পতঙ্গবাহিত রোগের বিস্তার ঘটতে পারে
খাদ্য ও পানির সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হবে
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী আরও সংকটে পড়বে
কৃষি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

কিছু দেশের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এশিয়ার বড় অংশে গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া দেখা দিতে পারে। এতে ফসল উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাতের কারণে কৃষি খাত চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এল নিনো নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে

তবে ডব্লিউএমও জানিয়েছে, এল নিনোর তীব্রতা নিয়ে এখনো কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। কিছু আবহাওয়া মডেল শক্তিশালী এল নিনো নয়, বরং মাঝারি মাত্রার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হলে চূড়ান্ত পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে।

জলবায়ু সংকটে বৈশ্বিক সতর্কতা

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া এখন জরুরি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “উষ্ণ হতে থাকা পৃথিবীতে এল নিনো আগুনের ওপর ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।”



সব মিলিয়ে, বিশ্ব এখন এমন এক জলবায়ু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে প্রাকৃতিক এল নিনো ও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন একসঙ্গে মিলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়াবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো প্রস্তুতি না নিলে এর প্রভাব হবে বহুমাত্রিক—পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে একসঙ্গে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স