নির্বাচনে পরাজয়ের পর দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে প্রকাশ্যে ফিরেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলায় এক গণআন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করার ঘোষণা দেন এবং রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিজেপিকে সরানোর লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেন।
এই কর্মসূচি ছিল নির্বাচনের পর প্রথম বড় রাজনৈতিক উপস্থিতি, যা ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের পর দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে মাঠে নামলেন মমতা
গত এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর ৪ মে ফল ঘোষণার পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত জনসমক্ষে অনুপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি নিজের কালীঘাটের বাসভবনেই সীমিত ছিলেন।
এই সময়ের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে অসন্তোষ, প্রশাসনিক স্তরে অস্থিরতা এবং দলীয় নেতৃত্বে বিভাজনের খবর সামনে আসে। একাধিক পৌরসভা চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরের দলত্যাগ এবং কিছু নেতার গ্রেপ্তারের ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
ধর্মতলায় ধরনা কর্মসূচি, পুলিশের অনুমতি নিয়ে টানাপোড়েন
তৃণমূল কংগ্রেসের ঘোষিত কর্মসূচি ছিল কলকাতার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে ধরনা। তবে পুলিশের অনুমতি না মেলায় শেষ পর্যন্ত ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, এই কর্মসূচির মূল বিষয় ছিল—
নির্বাচনের পরবর্তী সহিংসতা
হকার উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন সংকট
পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগ
এবং কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের “প্রতিহিংসামূলক আচরণ”
হ্যান্ডমাইক থেকে কড়া ভাষায় আক্রমণ
মঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, তাকে মাইক ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি, ফলে হ্যান্ডমাইকে বক্তব্য দিতে বাধ্য হন তিনি।
তিনি দাবি করেন, নির্বাচনে কারচুপি করে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে এবং সেই ফল তিনি মেনে নেন না। তাঁর ভাষায়, “বিজেপিকে হটানোর আন্দোলন চলবে।”
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস” ও “জনবিরোধী আচরণ” চলছে, যার বিরুদ্ধে রাজপথেই জবাব দেওয়া হবে।
আন্দোলনের হুঁশিয়ারি ও রাজনৈতিক বার্তা
মমতা বলেন, বিজেপি সরকার মানুষের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে এবং এর জবাব দিতে তৃণমূল কংগ্রেস রাজপথে নেমেছে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে লালবাজার, নবান্ন ও থানা ঘেরাওসহ বড় ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়া হবে।
তার বক্তব্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তিনি বলেন, “যেখানে বাধা দেবে, সেখানে অবস্থান কর্মসূচি চলবে।”
কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি
এই কর্মসূচিতে তৃণমূলের একাধিক শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন—
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, ফিরহাদ হাকিম, ডেরেক ও’ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মদন মিত্র, কুনাল ঘোষসহ আরও অনেকে।
তবে দলের সব বিধায়ক ও নেতা উপস্থিত ছিলেন না বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
দলের ভেতরে অস্থিরতা ও বিদ্রোহের ইঙ্গিত
নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিধানসভায় উপস্থিতি সংক্রান্ত অভিযোগে দুই বিধায়ককে বহিষ্কারের পর নতুন করে অন্তর্কোন্দল শুরু হয়। কিছু বিধায়ক দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেন।
এছাড়া দলীয় বৈঠকে বিধায়কদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার ঘটনাও নেতৃত্বকে অস্বস্তিতে ফেলেছে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: নতুন করে সংঘাতের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, এই জনসভা শুধু মমতার প্রত্যাবর্তন নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সংঘাতের সূচনা হতে পারে।
নির্বাচনের পর দলীয় দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং বিরোধী শক্তির উত্থান—সব মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস এখন একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে।
তবে মমতার প্রকাশ্য অবস্থান ও কঠোর রাজনৈতিক বার্তা দলের কর্মীদের মধ্যে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সংকেতও দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনের পর দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর প্রকাশ্যে ফিরে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনৈতিক যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে সংঘাত, উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।