ঢাকা

বেতন-জ্যেষ্ঠতা থেকে পদোন্নতি, ৫ সমস্যায় আটকে সরকারিকৃত কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কলেজ সরকারীকরণের উদ্যোগ নেওয়ার সময় শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, এক দশক পর এসে তার বড় অংশই পরিণত হয়েছে হতাশা ও অনিশ্চয়তায়। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া সরকারীকরণ প্রক্রিয়া এবং ২০১৮ সালের ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা’ বাস্তবায়নের পর এখন পর্যন্ত ৩৩৫টি কলেজ সরকারি হয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আত্তীকৃত নন-ক্যাডার শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়ার বদলে তারা নানা প্রশাসনিক জটিলতা, বৈষম্য ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে গত ৪ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক নন-ক্যাডার ঐক্যজোটের সদস্যরা। সেখানে তারা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানান। আন্দোলনকারীদের দাবি, দেশে বর্তমানে ১৬ হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি।

সরকারিকৃত বাঞ্ছারামপুর ডিগ্রি কলেজের নন-ক্যাডার প্রভাষক ফয়সাল হাবিব তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখেই তারা সরকারীকরণ প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে নানা বিধিবদ্ধ সীমাবদ্ধতা ও বৈষম্যের কারণে তাদের পেশাগত জীবন ক্রমেই সংকটময় হয়ে উঠেছে।

নিয়োগব্যবস্থার অনিশ্চয়তায় বাড়ছে শিক্ষক সংকট

নন-ক্যাডার শিক্ষকদের অন্যতম অভিযোগ, সরকারীকরণের পর নতুন শিক্ষক নিয়োগের জন্য সুস্পষ্ট কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি। তাদের মতে, ‘বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) নন-ক্যাডার নিয়োগ বিধি’ না থাকায় সরকারিকৃত কলেজগুলোতে নতুন প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

ফলে বহু কলেজে শিক্ষক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরাও ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।

বেতন গ্রেডে অবনমন নিয়ে ক্ষোভ

আন্দোলনরত শিক্ষকদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো বেতন কাঠামো নিয়ে। তাদের দাবি, বেসরকারি পর্যায়ে যে বেতন গ্রেডে তারা কর্মরত ছিলেন, সরকারীকরণের পর সেই গ্রেড বহাল রাখা হয়নি। বরং নতুন কাঠামোয় অনেকের বেতন ও আর্থিক সুবিধা কমে গেছে।

একই প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের দায়িত্ব পালন করলেও ক্যাডার ও নন-ক্যাডার শিক্ষকদের মধ্যে বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। এ বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষের কারণ হয়ে আছে।

পদোন্নতি ও বদলির সুযোগ না থাকায় থমকে ক্যারিয়ার

নন-ক্যাডার শিক্ষকদের মতে, সরকারি চাকরির অন্যতম আকর্ষণ হলো নিয়মিত পদোন্নতি ও বদলির সুযোগ। কিন্তু সরকারীকৃত কলেজের আত্তীকৃত শিক্ষকদের জন্য সে পথ কার্যত বন্ধ।

তাদের অভিযোগ, বহু শিক্ষক ১৫ থেকে ২০ বছর চাকরি করেও কোনো পদোন্নতি পাননি। পাশাপাশি এক কলেজ থেকে অন্য কলেজে পদায়ন বা বদলির সুযোগও নেই। ফলে কর্মজীবনে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা নিয়মিত পদোন্নতি ও বদলির সুযোগ পাচ্ছেন, যা বৈষম্যের অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে দাবি আন্দোলনকারীদের।

জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে অসন্তোষ

আত্তীকৃত শিক্ষকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ জ্যেষ্ঠতা ও চাকরিকাল গণনা নিয়ে। তারা বলছেন, বেসরকারি কলেজে চাকরির অভিজ্ঞতার পুরো সময়কাল জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। জটিল বিধান ও সূত্র প্রয়োগের কারণে অনেক শিক্ষক তাদের প্রকৃত অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এর ফলে পরে যোগদানকারী কেউ কখনো কখনো সিনিয়র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

স্থায়ীকরণ ও বকেয়া বেতন নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা

সরকারীকরণের পর আত্তীকৃত হলেও অনেক শিক্ষক-কর্মচারীর চাকরি এখনো স্থায়ী হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে স্থায়ীকরণ প্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় তারা প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

একই সঙ্গে বহু শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া বেতন ও ভাতা বছরের পর বছর আটকে আছে। অনেকের ক্ষেত্রে আড়াই থেকে তিন বছরের পাওনা পরিশোধ হয়নি বলে দাবি আন্দোলনকারীদের।

অবসর-সুবিধার চাঁদা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ

বেসরকারি কলেজে কর্মরত অবস্থায় শিক্ষকরা নিয়মিতভাবে অবসর-সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টে চাঁদা জমা দিয়েছেন। সরকারীকরণের পর ওই ট্রাস্টের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও জমাকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষকদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে জমা দেওয়া এই অর্থ তাদের ন্যায্য প্রাপ্য। বিধিমালার সীমাবদ্ধতার কারণে তা ফেরত না দেওয়া হলে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।

নন-ক্যাডার পদ না রেখে নতুন ক্যাডার পদ সৃজনের অভিযোগ

আন্দোলনরত শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো সরকারিকৃত কলেজগুলোতে নতুন করে ক্যাডার পদ সৃজনের উদ্যোগ। তাদের অভিযোগ, নন-ক্যাডার শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি না করে নতুন ক্যাডার পদ তৈরি করা হলে বিদ্যমান আত্তীকৃত শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

তাদের মতে, বছরের পর বছর কলেজে পাঠদান করা শিক্ষকদের স্থায়ীকরণ ও ক্যারিয়ার সুরক্ষা নিশ্চিত না করে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা হলে তা আরও বৈষম্যের জন্ম দেবে।

পাঁচ দফা দাবি

সমস্যাগুলোর সমাধানে সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক নন-ক্যাডার ঐক্যজোট পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছে।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

নন-ক্যাডার শিক্ষকদের জন্য পৃথক নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলি বিধিমালা প্রণয়ন;
প্রথম নিয়োগের তারিখ থেকে চাকরিকাল গণনা এবং পূর্ববর্তী বেতন গ্রেড বহাল রাখা;
সরকারিকৃত কলেজগুলোতে নন-ক্যাডার শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি ও শূন্য পদ পূরণ;
দ্রুত চাকরি স্থায়ীকরণ এবং বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ;
অবসর-সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টে জমা দেওয়া চাঁদার সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত প্রদান।
সমাধানের আহ্বান

আন্দোলনকারী শিক্ষক-কর্মচারীরা বলছেন, তাদের আন্দোলন কোনো বিশেষ সুবিধা আদায়ের জন্য নয়; বরং দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তাদের মতে, শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে শিক্ষাব্যবস্থার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তারা সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারীকৃত কলেজগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের বাস্তব সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে একটি বৈষম্যমুক্ত ও কার্যকর আত্তীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে বলে তারা সতর্ক করেছেন।

শিক্ষকদের ভাষ্য, সরকারীকরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণে এখনো বহু প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে, যা দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব পড়বে উচ্চশিক্ষা খাতের সামগ্রিক মান ও কার্যকারিতার ওপর।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স