যুক্তরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির মূল্য ও কার্যকারিতা নিয়ে জনসাধারণের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অর্জন সময় ও অর্থের যথার্থ বিনিয়োগ নয়। উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষার্থীঋণের বোঝা, চাকরির বাজারে বাড়তি প্রতিযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব—এসব কারণে উচ্চশিক্ষার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসছে বলে মনে করছেন গবেষক ও শিক্ষাবিদেরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত ব্রিটিশ সোশ্যাল অ্যাটিচিউডস (বিএসএ) জরিপে দেখা যায়, ২০০৫ সালে যেখানে মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ মনে করতেন বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অর্জন সময় ও অর্থের সঠিক মূল্য দেয় না, ২০২৫ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলে আর্থিকভাবে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করেন এমন মানুষের হার ৫০ শতাংশ থেকে কমে ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও বেড়েছে প্রতিযোগিতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষার প্রসারের ফলে আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অর্জন করছেন। ফলে স্নাতক পর্যায়ের চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে ডিগ্রি অর্জনের পরও প্রত্যাশিত আয় বা পেশাগত অগ্রগতি নিশ্চিত হচ্ছে না।
যুক্তরাজ্যে গত কয়েক দশকে উচ্চশিক্ষা খাতে ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। ১৯৮৩ সালে মাধ্যমিকের পর মাত্র ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতেন। বর্তমানে সেই হার বেড়ে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশটিতে এখন দুই মিলিয়নেরও বেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, উচ্চশিক্ষার এই গণতন্ত্রীকরণ সমাজে শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করলেও একই সঙ্গে ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে চাকরির বাজারে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির একক মূল্য আগের তুলনায় কিছুটা কমে গেছে।
টিউশন ফি ও ঋণের বোঝা বাড়াচ্ছে হতাশা
উচ্চশিক্ষা নিয়ে জনমতের পরিবর্তনের অন্যতম কারণ শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি। ১৯৯৮ সালে যুক্তরাজ্যে টিউশন ফি চালুর সময় বার্ষিক ফি ছিল এক হাজার পাউন্ড। বর্তমানে ইংল্যান্ডের শিক্ষার্থীদের বছরে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৫৩৫ পাউন্ড পর্যন্ত টিউশন ফি পরিশোধ করতে হয়। এর পাশাপাশি আবাসন, পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ও বহন করতে হয় শিক্ষার্থীদের।
জরিপে দেখা গেছে, যাঁরা টিউশন ফি-নির্ভর ব্যবস্থার আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা নিয়ে অসন্তোষের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। অনেকের মতে, স্নাতক শেষ করার পর বড় অঙ্কের শিক্ষার্থীঋণ তাঁদের আর্থিক জীবনে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীঋণ পরিশোধের জন্য নির্ধারিত আয়ের সীমা দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় না করে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ফলে অনেক স্নাতককে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার আর্থিক লাভ নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
এআই ও পরিবর্তিত চাকরির বাজার নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারও উচ্চশিক্ষা নিয়ে উদ্বেগের একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে। অনেক তরুণ ও অভিভাবক আশঙ্কা করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জিত কিছু দক্ষতা ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে। ফলে ডিগ্রি অর্জনের পরও স্থায়ী ও উচ্চ আয়ের চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা আগের মতো থাকবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এই সময়ে শুধু ডিগ্রি অর্জনই যথেষ্ট নয়; বরং পরিবর্তনশীল দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এখনো ডিগ্রির দীর্ঘমেয়াদি সুফলের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় খাত
তবে বিশ্ববিদ্যালয় খাতের প্রতিনিধিরা মনে করেন, উচ্চশিক্ষার মূল্য নিয়ে নেতিবাচক ধারণা বাস্তবতার পুরো চিত্র তুলে ধরে না। তাঁদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি এখনো ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।
ইউনিভার্সিটিজ ইউকের প্রধান নির্বাহী ভিভিয়েন স্টার্ন বলেন, ডিগ্রিধারীরা সাধারণত চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন, তাঁদের গড় আয় তুলনামূলক বেশি হয় এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থাও অপেক্ষাকৃত ভালো থাকে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য দক্ষ স্নাতকদের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।
অন্যদিকে হায়ার এডুকেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক নিক হিলম্যান বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা সব ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে না। তবে এখনো অধিকাংশ মানুষ উচ্চশিক্ষার মূল্য পুরোপুরি অস্বীকার করেন না।
শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতায় বাস্তবতার প্রতিফলন
ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টসের উচ্চশিক্ষাবিষয়ক সহসভাপতি অ্যালেক্স স্ট্যানলির অভিজ্ঞতা বর্তমান বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। কিন্তু পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে তাঁকে একসঙ্গে তিনটি চাকরি করতে হয়েছে, যা তাঁর শিক্ষাজীবন ও ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বর্তমানে তাঁর শিক্ষার্থীঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার পাউন্ডের বেশি। নিয়মিত পরিশোধ করলেও সুদ ও অন্যান্য কারণে ঋণের পরিমাণ কমার বদলে বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সামাজিক গতিশীলতা ও অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা
বিএসএ প্রতিবেদনের সহলেখক অ্যালেক্স স্কোলস সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়; এটি সামাজিক গতিশীলতা, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু শিক্ষার্থীঋণব্যবস্থা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং চাকরির বাজারে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ মানুষের মধ্যে উচ্চশিক্ষার মূল্য সম্পর্কে সন্দেহ বাড়িয়ে তুলছে।
তাঁর মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু শিক্ষার্থী ভর্তির হারই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে উচ্চশিক্ষা খাতের ভবিষ্যৎ টেকসই রাখতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির মূল্য নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, এ বিষয়ে জনমতের পরিবর্তন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। একদিকে বাড়তি ব্যয়, ঋণের চাপ ও চাকরির অনিশ্চয়তা উচ্চশিক্ষার প্রতি আস্থা কমাচ্ছে; অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় খাত এখনো দাবি করছে যে ডিগ্রি দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য লাভজনক বিনিয়োগ। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, সাশ্রয়ী ও কর্মমুখী করার চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে।