ঢাকা

শিক্ষাক্রম আধুনিকায়নে চার নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আনন্দময়, দক্ষতাভিত্তিক ও যুগোপযোগী করতে আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৭) থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে চারটি নতুন বিষয় চালু করতে যাচ্ছে সরকার। শিক্ষার্থীদের শারীরিক, সাংস্কৃতিক, কারিগরি ও মানবিক বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসব বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে ২০২৮ সাল থেকে একটি নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার।

সোমবার সচিবালয়ে শিক্ষা খাতে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচি উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষাখাতে চলমান সংস্কার, পাঠ্যক্রম পরিমার্জন, নতুন বিষয় সংযোজন, পরীক্ষার সময়সূচি এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চার বিষয়

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে দুটি নতুন বিষয় যুক্ত হবে। এগুলো হলো—

ক্রীড়া
সংস্কৃতি

অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আরও দুটি বাধ্যতামূলক বিষয় চালু করা হবে। সেগুলো হলো—

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা
লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস (Learning with Happiness)

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষাভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং বাস্তবজীবনের দক্ষতা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কেবল একটি বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীদের আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি, মানসিক বিকাশ এবং মানবিক মূল্যবোধ চর্চার একটি সমন্বিত উদ্যোগ। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাদান পদ্ধতির উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তৃতীয় ভাষা শেখানোর পরিকল্পনাও রয়েছে

মাহ্দী আমিন জানান, ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক চাহিদা বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখানোর বিষয়েও সরকার কাজ করছে। বিদ্যমান শিক্ষাকাঠামোর মধ্যেই একটি বৃহৎ অধ্যায় বা মডিউল যুক্ত করার মাধ্যমে ভাষা শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাক্রমকে আরও আধুনিক ও বাস্তবমুখী করতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

পাঠ্যবইয়ে চলবে আরও পরিমার্জন

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী নতুন শিক্ষাক্রম থেকে সরে এসে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যবই পুনর্বিন্যাস ও পরিমার্জনের উদ্যোগ নেয়।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের পাঠ্যবইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে কবিতা, প্রবন্ধ ও গদ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে ইতিহাসের অংশ হিসেবে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়েও গণ-অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত বিষয়বস্তু সংযোজন করা হয়। একই সঙ্গে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, আগামী বছরের পাঠ্যবইয়েও ইতিহাস ও দক্ষতাভিত্তিক বিষয়গুলোতে আরও কিছু পরিবর্তন আনা হবে। বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা বইয়ে নতুন বিষয়বস্তু সংযোজনের পাশাপাশি ব্যাপক পরিমার্জনের কাজ চলছে।

২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

নতুন চারটি বিষয় সংযোজনের পাশাপাশি সরকার সম্পূর্ণ নতুন একটি শিক্ষাক্রম প্রণয়নের কাজও শুরু করেছে। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষাক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিন মাস বা স্বল্প সময়ে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন করে ২০২৭ সালের জন্য কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তবে আরও বৃহত্তর পরিসরে শিক্ষাক্রম সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে এবং এর বাস্তব প্রতিফলন ২০২৮ সাল থেকে দেখা যাবে।

মন্ত্রী জানান, নতুন শিক্ষাক্রমে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে শিখনফল অর্জন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাস্তবজীবনে জ্ঞান প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তবে ২০২৮ সাল থেকে সব শ্রেণিতে একযোগে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে নাকি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

২০২৭ সালের এসএসসি ও এইচএসসির সময়সূচি ঘোষণা

সংবাদ সম্মেলনে আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচিও তুলে ধরা হয়।

ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে ৭ জানুয়ারি এবং শেষ হবে ৬ ফেব্রুয়ারি। অন্যদিকে ২০২৭ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে ৬ জুন এবং চলবে ১৩ জুলাই পর্যন্ত।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, বিভিন্ন অংশীজনের পরামর্শে পবিত্র রমজান শুরুর আগেই এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সে বিবেচনায় জানুয়ারির শুরুতেই পরীক্ষা আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সময়সূচি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হলেও আপাতত ঘোষিত সূচিই বহাল রয়েছে এবং সেটি কার্যকর থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০ জুলাই প্রকাশ হবে ২০২৬ সালের এসএসসির ফল

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আরও জানান, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল আগামী ২০ জুলাই প্রকাশ করা হবে।

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ২১ এপ্রিল এবং লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় ২০ মে। বর্তমানে ব্যবহারিক পরীক্ষা চলছে, যা ১৪ জুন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

এ বছর দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড–এর অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি, দাখিল ও ভোকেশনাল পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।

শিক্ষা সংস্কারের নতুন অধ্যায়ের দিকে

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, কারিগরি শিক্ষা ও আনন্দময় শিক্ষার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বহুমাত্রিক ও বাস্তবমুখী করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার সমালোচনার মধ্যে সরকার শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশ, দক্ষতা অর্জন এবং মানসিক সুস্থতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে যে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে, তা দেশের শিক্ষা সংস্কারের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, পাঠ্যবই উন্নয়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স