ঢাকা

চাকরির বাজারের চাহিদা মেটাতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা এবং উদ্যোক্তা দক্ষতা বিকাশে নতুন উদ্যোগ গ্রহণের কথাও জানিয়েছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এ তথ্য জানিয়েছেন। সোমবার সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভিন্ন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্য উপস্থিত ছিলেন।

মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হবে যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা গ্রহণ না করে বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখানো এবং কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

তিনি বলেন, “আমরা চাই শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি এবং কর্মদক্ষতায়ও সমানভাবে এগিয়ে যাক। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে এমন শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন, যা একজন শিক্ষার্থীকে একই সঙ্গে দক্ষ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।”

পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন বিষয়

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের অংশ হিসেবে নতুন পাঠ্যক্রমে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান শিক্ষা উপদেষ্টা। এর মধ্যে রয়েছে ক্রীড়া শিক্ষা, সংস্কৃতি শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে একটি নতুন বিষয়।

মাহদী আমিন বলেন, এসব বিষয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক আচরণ এবং বাস্তব জীবনের দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করা হবে।

তিনি বলেন, “আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্রীড়া বিষয়টি নতুন সাবজেক্ট হিসেবে চালু করা হবে। সংস্কৃতি বিষয়টিও পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে।”

তিনি আরও জানান, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বিষয়টির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দায়িত্বশীলতা, সহমর্মিতা এবং একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা দেওয়া হবে। এর লক্ষ্য হবে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করা।

তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব

বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি জানান, বিদ্যমান শিক্ষাকাঠামোর মধ্যেই একটি বিস্তৃত অধ্যায়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা হবে। এর ফলে তারা বৈশ্বিক শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারবে।

‘দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান এক দিনে সম্ভব নয়’

শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, গত ১৬ বছরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নানা ধরনের সমস্যা, সীমাবদ্ধতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এসব সমস্যা রাতারাতি কিংবা এক বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে।

তিনি বলেন, “শিক্ষাব্যবস্থার যেসব জায়গায় সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন প্রয়োজন, আমরা তা বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে করব। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প খাতের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ থাকবে।”

তাঁর মতে, ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা শেষ করেই কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত থাকে।

শিক্ষার্থীদের জন্য আসছে ১৪ লাখ ট্যাব

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মাহদী আমিন। তিনি জানান, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য বিপুলসংখ্যক ট্যাব সরবরাহের একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমাদের প্রায় ১৪ লাখ ট্যাব প্রয়োজন হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি বড় প্রকল্প। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ে পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।”

সরকারের আশা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ পাবে এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে।

দক্ষতা, নৈতিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার দিকে অগ্রযাত্রা

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণের দাবি ছিল বিভিন্ন মহলের।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন একাডেমিক জ্ঞান অর্জন করবে, অন্যদিকে কর্মমুখী দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আরও প্রস্তুত হয়ে উঠবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স