বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কথিত জোরপূর্বক ‘পুশ ইন’ প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট মানবিক সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। সংগঠনটি অবিলম্বে ভারতের কাছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তীব্র প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকারকে আরও দৃঢ় ও কার্যকর অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি দাবি করে, সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের একতরফা ও জোরপূর্বক পুশ ইন প্রচেষ্টা শুধু দুই দেশের বিদ্যমান প্রটোকল ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার পরিপন্থী নয়, বরং এটি একটি গুরুতর মানবিক সংকটও সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে সীমান্তে আটকে পড়া মানুষদের সুরক্ষা ও সংকট নিরসনে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছে তারা।
সীমান্তে মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ
বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা—বিশেষ করে পঞ্চগড়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং লালমনিরহাট অঞ্চলে বিএসএফ একাধিকবার জোরপূর্বক মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এর ফলে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিসহ বহু মানুষ সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ড বা শূন্যরেখা এলাকায় আটকা পড়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব মানুষ দিনের পর দিন খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
সংগঠনটির মতে, তীব্র গরম, বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে শিশু ও নারীদের এভাবে অনিরাপদ অবস্থায় আটকে রাখা মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
‘মানুষের মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি বলেছে, সীমান্তে আটকে পড়া ব্যক্তিদের জাতীয়তা, নাগরিকত্ব বা আইনি অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। তবে এসব জটিলতার ঊর্ধ্বে মানুষের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সংগঠনটির বক্তব্য, কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বা কৌশলগত স্বার্থের কারণে নারী, শিশু ও অসহায় মানুষকে মানবেতর পরিস্থিতিতে ফেলে রাখা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া যেকোনো সভ্য রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
তারা মনে করে, সীমান্তসংক্রান্ত বিরোধ বা নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিষয়গুলো আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত; মানবিক সংকট সৃষ্টি করে নয়।
সংকট নিরসনে ৬ দফা দাবি
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি ছয়টি জরুরি দাবি উত্থাপন করেছে।
প্রথমত, সীমান্তে বা নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকে থাকা মানুষদের জন্য অবিলম্বে জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। অনাহার, অসুস্থতা কিংবা চিকিৎসার অভাবে যেন কোনো প্রাণহানি না ঘটে, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বিএসএফের কথিত জোরপূর্বক পুশ ইন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারকে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক ও কড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তে এমন কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
তৃতীয়ত, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে এ বিষয়ে জবাবদিহি চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
চতুর্থত, যেকোনো নাগরিকের প্রত্যর্পণ বা পুশ ব্যাকের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার নীতি এবং দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তাদের মতে, পরিচয় যাচাই ছাড়া কাউকে জোরপূর্বক সীমান্ত অতিক্রম করানো আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
পঞ্চমত, সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী বাহিনীগুলোকে নিরস্ত্র ও বেসামরিক মানুষের প্রতি আরও মানবিক, সহনশীল ও সংবেদনশীল আচরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ও মানবিক মূল্যবোধের আলোকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হওয়া উচিত।
ষষ্ঠত, সীমান্তে আটকে পড়া ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় ও নাগরিকত্ব নির্ধারণে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার বা বেআইনিভাবে মানুষকে দুর্ভোগে ফেলার অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও আহ্বান
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি এ সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেছে। সংগঠনটি জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিক সমাজের প্রতি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক অবস্থান বা মতাদর্শগত বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। মানবিক সংকটকে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় না বানিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত এলাকায় পুশ ব্যাক বা পুশ ইন সংক্রান্ত অভিযোগ নতুন নয়। তবে নারী, শিশু ও অসহায় মানুষের সম্পৃক্ততায় মানবিক সংকটের বিষয়টি সামনে এলে তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি মানবাধিকার ইস্যুতেও নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।
এ প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নাগরিকত্ব যাচাই এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আরও সমন্বিত ও মানবিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ করে সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করাও জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো মানুষ সীমান্তের শূন্যরেখায় অনিশ্চয়তা ও মানবেতর পরিস্থিতির শিকার না হন।