ঢাকা

ইসলামী ব্যাংকের অর্থ নির্বাচনী তহবিলে ব্যবহারের অভিযোগ নাকচ জামায়াত আমিরের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-এর ঋণ, মালিকানা কাঠামো ও তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে জাতীয় সংসদে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সংসদীয় আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও শফিকুর রহমান সরকারের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন এবং সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।

তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেসব অভিযোগ তুলেছেন, সেখানে একটি নির্দিষ্ট দলের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, যদি সরাসরি কোনো দলকে উদ্দেশ্য করা হয়ে থাকে, তবে সেটি স্পষ্টভাবে নাম উল্লেখ করেই বলা উচিত ছিল।

শফিকুর রহমান বক্তব্যে বলেন, “যে অভিযোগ আনা হয়েছে, যদি তা জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশ্য করে হয়ে থাকে, তাহলে আমি চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছি। এটি প্রমাণ করতে পারলে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে একটি মেডেল দেব।”

সংসদে ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে তীব্র বাদানুবাদ

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময় এ উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পূর্ববর্তী মন্তব্যের জবাব দেন এবং ইসলামী ব্যাংকের ঋণ ও আর্থিক কার্যক্রম সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগকে ভিত্তিহীন বা অস্পষ্ট বলে দাবি করেন।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম (RDS) কোনো রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর নয়, বরং এটি একটি সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম। এ বিষয়ে আনা অভিযোগ তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

৭০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে প্রশ্ন

সংসদে আলোচনার সময় ইসলামী ব্যাংক থেকে ৭০০ কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ এবং তা নির্বাচনী তহবিলে ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, “এই ৭০০ কোটি টাকার ঋণ কে নিয়েছে, এবং তা যদি কোনো নির্বাচনী তহবিলে ব্যবহার হয়ে থাকে—এটা পরিষ্কার করা দরকার। যদি আমাকে বা আমার দলকে উদ্দেশ্য করা হয়ে থাকে, তাহলে আমি তা প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি।”

তিনি আরও দাবি করেন, কোনো ধরনের দলীয় ফান্ডে এক টাকাও গেলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আনা উচিত।

শেয়ার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ

সংসদীয় বক্তব্যে ব্যাংকের শেয়ার মালিকানা পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর চাপে শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে শেয়ার হস্তান্তর করানো হয়েছে।

নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি এককভাবে ব্যাংকের বড় অংশের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং এর মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক কাঠামোতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছেন।

তিনি বলেন, “শেয়ারগুলো কীভাবে হস্তান্তর হলো, তা তদন্ত হওয়া উচিত। চাপ প্রয়োগ করে মালিকানা পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে।”

ব্যাংক ধ্বংসের অভিযোগ ও অর্থনীতির ঝুঁকি

ইসলামী ব্যাংককে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান সতর্ক করে বলেন, ব্যাংকটির পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি বলেন, দেশের সাধারণ জনগণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এই ব্যাংকের গ্রাহক। তাই এটিকে কোনো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয়।

তাঁর ভাষায়, “ইসলামী ব্যাংক যদি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়বে।”

শেয়ার ফেরত ও পুনর্গঠন প্রস্তাব

শফিকুর রহমান দাবি করেন, পূর্বে যাদের কাছ থেকে শেয়ার নেওয়া হয়েছিল, তাদের ন্যায্য মূল্যসহ সেগুলো ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। এরপর সরকার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকের নতুন বোর্ড গঠন করতে পারে বলে তিনি মত দেন।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনা নিশ্চিত করাই উচিত।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বৃহত্তর বিতর্ক

বক্তৃতায় তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ব্যাংক খাতে কিছু সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি, তবে বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংক ঘিরে চলমান এই বিতর্ক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধ বিষয় নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা, মালিকানা কাঠামো এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও তদন্ত, ব্যাখ্যা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার দাবি তুলছে—যা ভবিষ্যতে সংসদীয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও আলোচনার জন্ম দিতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স