দেশের অর্থবছর পদ্ধতিকে ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সমন্বয় করার প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও শফিকুর রহমান। তাঁর মতে, বর্তমানে প্রচলিত জুলাই-জুন ভিত্তিক অর্থবছর ব্যবস্থায় উন্নয়ন ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, বিশেষ করে বছরের শেষ পর্যায়ে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা দেখা যায়।
মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামী-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
‘শেষ সময়ে তড়িঘড়ি উন্নয়ন কাজ, জনগণ বঞ্চিত হয় সুফল থেকে’
শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে অর্থবছর জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত নির্ধারিত। কিন্তু জুন মাসে বর্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাইক্লোনসহ নানা প্রতিকূলতা থাকে, ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়।
তিনি বলেন, “এডিপির একটা বড় অংশ শেষ দুই মাসে তাড়াহুড়া করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। এটি প্রকৃত উন্নয়ন নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি গণলুটপাটে পরিণত হয়। এর সুফল জনগণ পায় না, বরং কিছু অসৎ সুবিধাভোগীর পকেটে চলে যায়।”
এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে অর্থবছর মিলানোর প্রস্তাব
বিরোধীদলীয় নেতা জানান, তারা সংসদে প্রস্তাব দেবেন যাতে অর্থবছরকে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।
তার ভাষায়, “আমরা সংসদে প্রস্তাব দেব, আমাদের ফিসক্যাল ইয়ার ক্যালেন্ডার ইয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে করা হোক। তাহলে বর্ষার পানিতে টাকাগুলো ধুয়ে-মুছে যাবে না। প্রকৃত হিসাব পাওয়া যাবে।”
তিনি মনে করেন, এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে উন্নয়ন বাজেটের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মানও উন্নত হবে।
‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি’
অনুষ্ঠানে শফিকুর রহমান দেশের আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তোলেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংক ও বিমা খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
তার ভাষায়, “এভাবে যদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর রাজনৈতিক অন্যায্য হস্তক্ষেপ চলতে থাকে, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা বলা কঠিন।”
বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর জোর
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, শুধু বড় বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, সেটি বাস্তবায়নের জন্য সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, “যদি এগুলো না থাকে, তাহলে যে বাজেটই দেওয়া হোক না কেন, সেটি কার্যকর হবে না।”
তিনি আরও দাবি করেন, সম্পূরক বাজেট সাধারণত অর্থবছরের শেষ পর্যায়ে সংসদে আনা হয়, ফলে প্রকৃত ব্যয়ের স্বচ্ছতা ব্যাহত হয়।
কর ব্যবস্থার সমালোচনা
দেশের বিদ্যমান কর ব্যবস্থাকে ত্রুটিপূর্ণ বলে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, সাধারণ জনগণ কর প্রদান করলেও তার একটি অংশ সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে না গিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে অন্যত্র চলে যায়।
তিনি বলেন, “ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ, ফলে প্রকৃত কর আদায়ের হারও কমে যাচ্ছে। যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে করদাতারা আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে কর দেবেন।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে মন্তব্য
অনুষ্ঠানে তিনি অতীত ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময় জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, যার ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা কমে গেছে।
তিনি দাবি করেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ থাকলেও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অংশগ্রহণ ও উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন সাইফুল আলম খান। সঞ্চালনা করেন দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আহমাদ আলী কাসেমী, আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, তাসমিয়া প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, নায়েবে আমির মজিবুর রহমান ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ উপস্থিত ছিলেন।
সার্বিক পর্যবেক্ষণ
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থবছর কাঠামো পরিবর্তনের এই প্রস্তাব প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে। তবে এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বাজেট ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্পের সময়সূচি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই প্রস্তাব বাজেট ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনা সৃষ্টি করেছে।