মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি ও কৃষি খাতে ভর্তুকি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রায় ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ-এর সভাপতিত্বে অধিবেশনের শুরুতেই এ বিষয়ে আলোচনা হয়।
বিএনপির সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন-এর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, চারটি প্রধান খাতে ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে তেল খাতে প্রায় ১০ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, গ্যাসে ১১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা, বিদ্যুতে ১৯ হাজার ৮২১ কোটি টাকা এবং সারে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে।
বৈশ্বিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব
অর্থমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে চলমান সংঘাত বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে অপরিশোধিত তেল, এলএনজি এবং সার আমদানির ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং শিল্প খাতেও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে।
অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক ঝুঁকি
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, প্রবাসী আয় এবং বিদেশে কর্মসংস্থান খাতেও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা প্রবাসী আয়প্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সরকারী নীতি ও পদক্ষেপ
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা
প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখা
বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সতর্ক নীতি অনুসরণ
বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান
তিনি আরও বলেন, খাতভিত্তিক প্রকৃত ক্ষতির নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
ভর্তুকি নীতির লক্ষ্য
অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো সাধারণ জনগণ, কৃষি ও উৎপাদন খাতকে সুরক্ষা দেওয়া। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশীয় বাজারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষিপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভর্তুকি নীতির মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে জনগণকে মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজেট ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সংঘাতজনিত কারণে জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি ক্ষেত্রে সরকারকে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।