ঢাকা

ট্রাম্পের নির্দেশে থেমে যায় ইরানের ইউরেনিয়াম দখল অভিযান: সিএনএন প্রতিবেদন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জোরপূর্বক দখলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল সামরিক অভিযান পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে থামিয়ে দেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মে মাসের দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সদর দপ্তরে একটি অত্যন্ত গোপন ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।

গোপন ব্রিফিং ও সামরিক নেতৃত্বের উপস্থিতি

সিএনএনের সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সেই সময় ন্যাটো বৈঠক শেষে দ্রুত আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ফ্লোরিডায় পৌঁছান। ১৯ মে টাম্পায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠককে অত্যন্ত জরুরি ও সংবেদনশীল বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, ওই ব্রিফিংয়ের উদ্দেশ্য ছিল ইরানে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জোরপূর্বক দখলের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে বিশদ আলোচনা করা।

ট্রাম্পের কাছে পরিকল্পনা উপস্থাপন ও সিদ্ধান্ত

বৈঠকের পর জেনারেল কেইন সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিভিন্ন বিকল্প সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবহিত করেন বলে দাবি করেছে সূত্রগুলো। তবে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প সেই পরিকল্পনায় অনুমোদন দেননি এবং সেটি কার্যত স্থগিত করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সতর্ক করা হয়েছিল যে এই ধরনের স্থল অভিযান ইরানের কঠোর প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে এবং তা একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।

যুদ্ধ বিস্তারের ঝুঁকি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব

সূত্রগুলোর মতে, ইরানের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুতর সংকট তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোতে।

এছাড়া, মার্কিন সেনাদের ব্যাপক হতাহতের ঝুঁকি এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনাও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখে বলে জানানো হয়েছে।

পারমাণবিক উপাদান ও ইরানের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন। ধারণা করা হয়, ইরানের কাছে থাকা ইউরেনিয়াম দিয়ে একাধিক পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরানের ইউরেনিয়াম প্রধানত ইস্পাহান, নাতাঞ্জ ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় সংরক্ষিত রয়েছে, যার কিছু অংশ গভীর ভূগর্ভে অবস্থিত।

পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উপাদান যুদ্ধকালীন অভিযানে সম্পূর্ণভাবে শনাক্ত ও উদ্ধার করা অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত।

ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও বৈশ্বিক ঝুঁকি

সিএনএনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল অভিযানের জবাবে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করার পরিকল্পনা বিবেচনা করতে পারে, যার মধ্যে হরমুজ ও বাব–এল–মান্দেব প্রণালি উল্লেখযোগ্য।

এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ববাণিজ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, যদিও হুতিরা এখনো সরাসরি মার্কিন বা ইউরোপীয় জাহাজে বড় ধরনের হামলা চালায়নি, তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে তারা তাদের লক্ষ্যবস্তু বিস্তৃত করতে পারে।

কূটনৈতিক আলোচনার প্রেক্ষাপট

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। দুই দেশই একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়, যেখানে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সীমিত করার বিষয় ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে সামরিক অভিযান শুরু হলে চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার ঝুঁকি ছিল বলেও সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

মার্কিন সামরিক কমান্ডারদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে স্থল অভিযানের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে সতর্ক করে আসছিলেন। তাদের মতে, এ ধরনের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, অস্ত্রভাণ্ডার এবং বৈশ্বিক কৌশলগত অবস্থানেও চাপ পড়তে পারে।



সিএনএনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান পরিকল্পনা ছিল উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও বহুমাত্রিক প্রভাবসম্পন্ন। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই পরিকল্পনা স্থগিত করেন সম্ভাব্য সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা বিবেচনায় রেখে।

এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি, পারমাণবিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স