যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচিত শান্তিচুক্তিটি আজ রোববার সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে বলে তিনি দাবি করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম BBC–এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে এ মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের ঘোষণা ও হরমুজ প্রণালি ইস্যু
ট্রাম্প লিখেছেন, চুক্তি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হরমুজ প্রণালি সব পক্ষের জন্য খুলে দেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
সম্প্রতি ইরানের অবস্থান ও সামরিক উত্তেজনার কারণে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, যার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও ২৪ ঘণ্টার সময়সীমার ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, দুই পক্ষ একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
তিনি বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এরপর প্রযুক্তিগত পর্যায়ের আলোচনা শুরু হতে পারে।
ইরানের সতর্ক অবস্থান
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই চুক্তি সইয়ের সময়সূচি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, সমঝোতা স্মারক সইয়ের নির্দিষ্ট তারিখ এখনই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, রোববার চুক্তি সই হচ্ছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
পারমাণবিক কর্মসূচি ও ট্রাম্পের মন্তব্য
ট্রাম্প তার পোস্টে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়েও ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ভবিষ্যতে যখন পরিস্থিতি শান্ত হবে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক উপাদান সংগ্রহ করে তা ধ্বংস করবে।
পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তবে তেহরান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক অবস্থান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তার মতে, সম্ভাব্য চুক্তি আঞ্চলিক সংঘাত, বিশেষ করে লেবাননের পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও জানান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কিছু অবরোধ শিথিল করার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তী পর্যায়ে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও শর্ত
মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি চুক্তির অংশ হতে পারে, তবে তা নির্ভর করবে ইরানের শর্ত পূরণের ওপর।
এর আগে ওয়াশিংটন বলেছিল, লেবানন সংঘাত চুক্তির মূল অংশ নাও হতে পারে। তবে ইরান এই বিষয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সংঘাতের পটভূমি
গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলার পর পরিস্থিতি যুদ্ধের দিকে গড়ায়।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়।
এপ্রিল মাসে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এরপরও দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
অনিশ্চয়তার মধ্যে চুক্তির ভবিষ্যৎ
যদিও উভয় পক্ষই একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানোর কথা বলছে, তবুও সময়সূচি, শর্ত এবং আঞ্চলিক ইস্যু নিয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অংশ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে চুক্তি বাস্তবায়ন, সময়সূচি এবং আঞ্চলিক ইস্যুতে স্পষ্টতা না আসায় পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।