বগুড়ার নবঘোষিত চারটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামতের ভিত্তিতে গণশুনানি করে নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। অনেকেই জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো গণশুনানির কথা জানেন না।
অভিযোগ উঠেছে, নতুন চার ইউনিয়নের মধ্যে দুটি ইউনিয়নের নাম স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিলে গেছে। একটি ইউনিয়নের নামকরণ হয়েছে তাঁর পৈতৃক বাড়ির নামে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে।
চার নতুন ইউনিয়নের নাম নিয়ে বিতর্ক
গত ১১ জুন বগুড়া জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি এবং নবঘোষিত মোকামতলা উপজেলার আটটি ইউনিয়নের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করা হয়। এর মধ্যে চারটি নতুন ইউনিয়নের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে ‘মীরবাড়ী’। অন্যদিকে মোকামতলা উপজেলায় নতুন তিনটি ইউনিয়নের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’।
অভিযোগ রয়েছে, শিবগঞ্জের নতুন ‘মীরবাড়ী ইউনিয়ন’ নামটি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ি মীরবাড়ীর নামে করা হয়েছে। আর মোকামতলার ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের নাম তাঁর দুই ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামের সঙ্গে মিলে গেছে।
যদিও প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন, নামগুলোর সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামের মিল হওয়া কেবলই কাকতালীয়।
সংসদে প্রশ্ন, প্রতিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তোলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ। পরে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা দেন।
সংসদে তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের যাচাই-বাছাইয়ের পর গণশুনানির মাধ্যমে নতুন ইউনিয়নের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সৈয়দপুর ইউনিয়ন গাবতলী ও সোনাতলা উপজেলার সীমান্তবর্তী হওয়ায় এর নাম ‘সীমান্ত’ রাখা হয়েছে। আর অন্য ইউনিয়নটি গাইবান্ধার কাছাকাছি ও দূরবর্তী হওয়ায় ‘দিগন্ত’ নাম দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “মিরাকেলি আমার সন্তানদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে ঠিকই। আমাদের সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত, মীর দিগন্ত। আমার যদি উদ্দেশ্য থাকত, তাহলে জেলা প্রশাসককে বলতাম নাম রাখেন ‘মীর সীমান্ত’ বা ‘মীর দিগন্ত’। কিন্তু নামের আগে তো মীর নেই।”
সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা এ সময় টেবিল চাপড়ে তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করেন।
ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নাম নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ১১ ধারার (২) উপধারার (১) অনুযায়ী, ইউনিয়নের নাম কোনো ব্যক্তির নামে করা যাবে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বলেন, একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজ বাড়ি ও দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিল রেখে সরকারি প্রশাসনিক ইউনিটের নামকরণ হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক ও দৃষ্টিকটু।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অতীতেও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিবারের নামে সরকারি স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠানের নামকরণের নজির রয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়নি।
প্রশাসনের দাবি, হয়েছে গণশুনানি
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) পাওয়ার পর দুই উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি জানান, নতুন ইউনিয়নের নাম নির্ধারণের আগে এলাকাবাসীর মতামত নিতে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেনকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
কমিটির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন জানান, ১৯ মে বেলা ১টায় বেতগাড়ী গ্রামের মীরবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গণশুনানি হয়। সেখানে শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি ‘মীরবাড়ী’ নামের প্রস্তাব করেন।
একই দিন সকাল সাড়ে ১০টায় ময়দানহাটা ইউনিয়নের দাড়িদহে আরেকটি গণশুনানি হয়। সেখানে বিমল কুমার রায় ‘স্বর্ণগ্রাম’ নামের প্রস্তাব দেন।
এ ছাড়া ২০ মে সৈয়দপুর ইউনিয়নের হাবিবপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং দেউলী ইউনিয়নের ভরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে পৃথক গণশুনানি হয়। সেখানে বেলাল হোসেন ও শাহিনুর ইসলাম যথাক্রমে ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ নামের প্রস্তাব দেন।
তবে গণশুনানির ছবি বা লিখিত নথি চাইলে কমিটির সভাপতি তা সরবরাহ করতে পারেননি।
স্থানীয়দের দাবি, গণশুনানির কথা তাঁরা জানেন না
প্রশাসনের নথি অনুযায়ী, ২০ মে দেউলী ইউনিয়নের ভরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে গণশুনানির মাধ্যমে ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের নাম নির্ধারণ করা হয়।
তবে ভরিয়া গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমন কোনো গণশুনানির বিষয়ে তাঁরা অবগত ছিলেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বলেন, “এ ধরনের গণশুনানি হলে গ্রামের কেউ না কেউ জানতেন। কিন্তু আমার জানামতে কাউকে ডাকা হয়নি।”
আরেক বাসিন্দা সজীব মিয়াও বলেন, গণশুনানি হলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ত।
ভরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ আলম বলেন, গণশুনানির কথা বলে স্থানীয় কিছু লোক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষের চাবি নিয়েছিলেন। তাঁদের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও ছিলেন। তবে সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, তা তিনি জানেন না।
প্রস্তাবকদের রাজনৈতিক পরিচয়
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ নামের প্রস্তাবক শাহিনুর রহমান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি শিবগঞ্জ উপজেলার দেউলী ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি।
শাহিনুর রহমান বলেন, ২০ মে বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে গণশুনানিতে ২০ থেকে ২৫ জন দলীয় নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি নতুন ইউনিয়নের নাম ‘দিগন্ত’ রাখার প্রস্তাব দেন।
তাঁর ভাষ্য, প্রতিমন্ত্রীর ছেলে দিগন্ত হওয়ায় নামের সঙ্গে মিল হয়েছে কেবল কাকতালীয়ভাবে।
অন্যদিকে ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’-এর প্রস্তাবক বেলাল হোসেন সৈয়দপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য।
তিনি দাবি করেন, গণশুনানিতে বিভিন্ন পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন এবং এলাকার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তিনি ‘সীমান্ত’ নাম প্রস্তাব করেন।
‘মীরবাড়ী’ নাম নিয়েও প্রশ্ন
১৯ মে বেতগাড়ী গ্রামের মীরবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গণশুনানির মাধ্যমে ‘মীরবাড়ী ইউনিয়ন’ গঠন করা হয়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অনেকে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবর রহমান বলেন, ১৯ মে বিদ্যালয় মাঠে গণশুনানি হয়েছে, তবে সেখানে কী আলোচনা হয়েছে তা তিনি জানেন না।
নাম প্রস্তাবকারী শফিকুল ইসলাম বলেন, তাঁকে কয়েকজনের সঙ্গে উপজেলা পরিষদে ডাকা হয়েছিল। তাঁর দাবি, মীরবাড়ী একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবার এবং এলাকার উন্নয়নে তাদের ভূমিকা রয়েছে। এ কারণেই তিনি মীরবাড়ী নামের প্রস্তাব করেছেন।
‘স্বর্ণগ্রাম’ নাম নিয়েও আপত্তি
ময়দানহাটা ইউনিয়ন ভেঙে ‘স্বর্ণগ্রাম’ ইউনিয়ন গঠনের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের দাবি, ১৯ মে দাড়িদহ মোমেনা বক্কর কৃষি ডিপ্লোমা কলেজ মাঠে গণশুনানির মাধ্যমে নামটি নির্ধারণ করা হয়।
কলেজের অধ্যক্ষ রেজাউল ইসলাম বলেন, সেখানে ২০০ থেকে ২৫০ জন মানুষ উপস্থিত ছিলেন এবং বিমল কুমার রায় ‘স্বর্ণগ্রাম’ নাম প্রস্তাব করেন।
তবে বিমল কুমার রায় বলেন, এটি আনুষ্ঠানিক গণশুনানি ছিল না। কয়েকজনের আলোচনার সময় তিনি ‘স্বর্ণগ্রাম’ নামের প্রস্তাব করেছিলেন।
স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি ছিল, পুরোনো বন্দর ও এলাকার ঐতিহ্যের কারণে নতুন ইউনিয়নের নাম ‘দাড়িদহ’ রাখা হোক।
ময়দানহাটা ইউনিয়ন পরিষদের সাময়িক বরখাস্ত চেয়ারম্যান আবু জাফর মন্ডল বলেন, ‘স্বর্ণগ্রাম’ নামে কোনো গ্রাম বা মৌজা নেই। এলাকাবাসীর মতামত উপেক্ষা করে নিজেদের ইচ্ছামতো নাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
চারটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে প্রশাসনের দাবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যের এই পার্থক্য এখন প্রশ্ন তুলেছে—নাম নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অর্থে কতটা অংশগ্রহণ ছিল সাধারণ মানুষের।
নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক