যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। ইসলামাবাদ দাবি করছে, এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে তারা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে—এই কূটনৈতিক উদ্যোগের বিনিময়ে পাকিস্তান বাস্তবে কী লাভ করতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, তাৎক্ষণিক বড় অর্থনৈতিক সুবিধার চেয়ে পাকিস্তানের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে আঞ্চলিক অবস্থান শক্তিশালী করা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সেতুবন্ধনের চেষ্টা
সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি অবকাশকেন্দ্র বুর্গেনস্টকে এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল-থানির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। কয়েক মিটার দূরে ছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির।
নিজের বক্তব্যে ভ্যান্স বিশেষভাবে মুনিরের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে তিনি অন্য যেকোনো ব্যক্তির তুলনায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে বেশি আলোচনা করেছেন।
ভ্যান্সের এ বক্তব্য পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রেখে ইসলামাবাদ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এরপর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ইসলামাবাদ সফর সেই ভূমিকাকে আরও দৃশ্যমান করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনার পর এটি ছিল তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। সফরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে পাকিস্তানের সহযোগিতার প্রশংসা করেন।
৬০ দিনের আলোচনার পেছনে পাকিস্তানের ভূমিকা
গত কয়েক মাসে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের একটি অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
ইসলামাবাদ পেছনের দরজার যোগাযোগ, বৈঠকের আয়োজন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছে।
১৮ জুন যে শান্তিচুক্তির বিষয়ে সমঝোতা এবং পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার পেছনে পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতাও ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে পাকিস্তানের জন্য মূল প্রশ্ন হলো—এই কূটনৈতিক অর্জন কি দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে সহায়তা করবে?
অর্থনৈতিক লাভ কতটা?
পাকিস্তানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, দুর্বল রপ্তানি এবং রাজস্ব ঘাটতির সমস্যায় ভুগছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে এবং প্রবাসী আয়ও বেড়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব পরিসংখ্যানের পেছনে কাঠামোগত উন্নতির চিত্র খুব স্পষ্ট নয়।
লাহোরভিত্তিক অর্থনীতিবিদ হিনা শেখ বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতা থেকে সরাসরি বড় ধরনের অর্থনৈতিক লাভের সম্ভাবনা সীমিত। তবে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিক হলে পাকিস্তানের জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে দীর্ঘদিন আটকে থাকা ইরান–পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প আবার আলোচনায় আসতে পারে।
আইএমএফ নির্ভরতা ও পুরোনো সংকট
পাকিস্তান বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৭০০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এটি ২০২৪ সালে অনুমোদিত হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।
দেশটির মূল সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্বল করব্যবস্থা, সীমিত রপ্তানি সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের চলতি হিসাবের ঘাটতি।
এর আগেও ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পর ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ার কারণে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সহায়তা পেয়েছিল। কিন্তু সেই সহায়তা অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা দূর করতে পারেনি।
আঞ্চলিক সুবিধার সম্ভাবনা
পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মতে, এই কূটনৈতিক উদ্যোগের বড় সুবিধা হতে পারে আঞ্চলিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে।
ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা কমলে বেলুচিস্তান সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ইরান–পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তবে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে একসঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামাবাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
রিয়াদভিত্তিক কিং ফয়সাল সেন্টার ফর ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজের গবেষক উমর করিম বলেন, পাকিস্তান এমন একটি সময়ে মধ্যস্থতার সুযোগ পেয়েছিল, যখন যুক্তরাষ্ট্র অন্য কোনো সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিল না।
তাঁর মতে, পাকিস্তান ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া এবং একই সঙ্গে সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্কের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কারণে এই ভূমিকা নিতে পেরেছে।
তবে তিনি বলেন, পাকিস্তানের প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। দেশটি এখনো এমন অবস্থানে পৌঁছায়নি, যেখান থেকে তারা ইরানকে বড় কোনো ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারে বা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সবচেয়ে বেশি লাভবান কারা?
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় সবচেয়ে দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
বিশেষ করে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব ঐতিহাসিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, এই কূটনৈতিক সাফল্যের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে কি না।
প্রতিরক্ষাবিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন বলেন, প্রকৃত পরীক্ষা হবে তখনই, যখন এই উদ্যোগের অর্থনৈতিক সুবিধা পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল বেলুচিস্তানের মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার সমস্যায় ভুগছে।
তুঘরাল ইয়ামিন বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল যদি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ভাগ করা যায়, তাহলে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় তা সহায়ক হতে পারে।
সামনে বড় সুযোগ, তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের টানাপোড়েনে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছে। তবে এই অবস্থানকে স্থায়ী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করা সহজ হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কূটনৈতিক সাফল্যকে বাস্তব বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগানো।
অতীতের মতো কেবল আন্তর্জাতিক সমর্থনের ওপর নির্ভর না করে যদি পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ সংস্কার এগিয়ে নিতে পারে, তবে এই কূটনৈতিক সুযোগ দেশটির জন্য বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।