নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের সার্বিক নারী উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচন ব্যবস্থায় নারীবান্ধব কাঠামো গড়ে তোলা।
রাজধানীতে আয়োজিত ‘নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব বিকাশ’ শীর্ষক জাতীয় সিম্পোজিয়ামে বক্তারা এসব কথা বলেন। নাগরিক সমাজের প্ল্যাটফর্ম ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শনিবার সকাল থেকে দিনব্যাপী রাজধানীর মিন্টো রোডের একটি হোটেলে এ সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয়।
বক্তারা বলেন, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুধু নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয় নয়; এটি একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্যতম শর্ত। এ জন্য রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-তে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে।
সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন: নির্বাচন কমিশনার
সিম্পোজিয়ামের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, দেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, এই সম্মিলিত উদ্যোগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক সংস্কারকে আরও কার্যকর করবে।
সমাপনী অধিবেশনে সভা প্রধান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির।
সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব
উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য দেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী। তিনি বলেন, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব বিকাশে সমাজের সব পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এই সচেতনতা বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা বলেন, নারী ও পুরুষ নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী সমানভাবে কাজ করার সুযোগ পাওয়াই প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কারের অংশ।
নারীদের শুধু ভোটার নয়, নেতৃত্বেও আনতে হবে
জাতিসংঘের সংস্থা ইউএন উইমেনের রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জলী সিং বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র শুধু নারীর বিষয় নয়, এটি গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সুশাসন শক্তিশালী করতে নারীদের শুধু ভোটার হিসেবে নয়, নির্বাচনের প্রার্থী, রাজনৈতিক নেতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (পলিটিক্যাল) হ্যারি থমসন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীর অংশগ্রহণকে কেবল সুযোগ হিসেবে নয়, বরং একটি শক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
কানাডিয়ান হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট, জেন্ডার ইকুয়ালিটি) স্টেফানি সেন্ট লরেন্ট ব্রাজার্ড বলেন, জেন্ডার সমতা শুধু গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয় নয়, এর সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নও জড়িত।
তিনি বলেন, নারীরা যখন রাজনীতি ও নেতৃত্বে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন, তখন তাঁরা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখেন এবং সমাজ আরও শক্তিশালী হয়।
রাজনৈতিক সংস্কারে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সহসাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, রাজনীতিতে গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে হলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব বিকাশের বিষয়টি নিয়মিত আলোচনায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন কমিশনের নয়; এ ক্ষেত্রে বৃহৎ জনগোষ্ঠীরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, নারীর প্রতি সব ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দাবিনামা উপস্থাপন
দিনব্যাপী আলোচনায় উঠে আসা মতামত, বিভাগীয় পর্যায়ের সংলাপ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা এবং আরপিও বিষয়ে পরিচালিত সমীক্ষার সুপারিশের ভিত্তিতে ‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দাবিনামা’ শীর্ষক একটি খসড়া উপস্থাপন করা হয়।
দাবিনামায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্টসংখ্যক নারী প্রার্থী মনোনয়ন;
দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার সব স্তরে নারী-পুরুষের সমান ৫০-৫০ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা;
রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়মিত জেন্ডার নিরীক্ষা চালু করা;
নারীর প্রতি রাজনৈতিক সহিংসতা মোকাবিলায় অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা;
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করা।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ
সিম্পোজিয়ামে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি, নুসরাত তাবাসসুম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য লুনা নূর, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সম্পাদক হাবীবা চৌধুরী, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসরিন সুলতানা মিলি, গণসংহতি আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক জুলহাসনাইন বাবু এবং স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ও মানবাধিকার সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ইলিরা দেওয়ানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সিম্পোজিয়ামে বক্তারা বলেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।