ঢাকা

রাজনৈতিক রোডম্যাপ নিয়ে জামায়াতের ৭ প্রস্তাব, গুরুত্ব গণভোট ও স্থানীয় নির্বাচনে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সীমান্ত পরিস্থিতি, প্রশাসনে দলীয়করণ এবং জুলাই গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতিসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সাত দফা প্রস্তাব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

দলটির প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ, দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা, বেসরকারি স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অবসরসুবিধা নিশ্চিত করা এবং জুলাই গণহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা।

এ ছাড়া সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়া, কথিত ‘পুশ ইন’ এবং পানিসংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে দলটি।

শুক্রবার অনুষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সভা শেষে এসব প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলটি জানায়, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই সর্বসম্মতিক্রমে এসব প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দাবি

জামায়াতের প্রথম প্রস্তাবে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রস্তাবে বলা হয়, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।

দলটির মতে, জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে হলে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি

দ্বিতীয় প্রস্তাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

জামায়াত বাজার তদারকি জোরদার, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম বাড়ানো এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছে।

একই সঙ্গে উৎপাদন খাত সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত এবং জ্বালানি খাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কঠোর পদক্ষেপ

তৃতীয় প্রস্তাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জামায়াত।

দলটি বলেছে, হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েছে। এসব অপরাধ দমনে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

প্রস্তাবে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং বাহিনীর পেশাদারত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

ধর্ষণ প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগের আহ্বান

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে জামায়াতের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি করে হত্যা করছে এবং অবৈধভাবে বাংলাদেশে লোক প্রবেশ করানোর চেষ্টা করছে।

এসব বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান নেওয়া, বিজিবির তৎপরতা বৃদ্ধি, কূটনৈতিক প্রতিবাদ এবং আন্তর্জাতিক মহলের সম্পৃক্ততার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া ভারতের পানিসংক্রান্ত নীতির বিষয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আরও সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি

চতুর্থ প্রস্তাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবি জানিয়েছে জামায়াত।

দলটি বলেছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন।

এ জন্য এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সরকারদলীয় নেতাদের অপসারণের দাবি জানিয়েছে দলটি।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার প্রস্তাব

পঞ্চম প্রস্তাবে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

দলটির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা ও সততাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

এ ছাড়া শক্তিশালী ও স্বাধীন সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের দাবি

ষষ্ঠ প্রস্তাবে বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবসরসুবিধা দ্রুত দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে দলটি।

জুলাই গণহত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্নের দাবি

সপ্তম প্রস্তাবে জুলাই গণহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচার দ্রুত, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জামিনে মুক্তি জনমনে উদ্বেগ তৈরি করছে। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচার কার্যক্রম দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের প্রত্যাশা

প্রস্তাবের শেষাংশে জামায়াতে ইসলামী আশা প্রকাশ করেছে, এসব দাবি আন্তরিকতা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসন ও আইনের শাসন আরও শক্তিশালী হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স