ঢাকা

ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান পুতিনের, কারণ জানালেন বিশ্লেষকেরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আল–জাজিরা | প্রতিবেদন

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের কোনো তাৎক্ষণিক ইঙ্গিত না দিয়ে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সীমিত করা এবং উভয় পক্ষের আক্রমণ কমানোর বিষয়ে কিয়েভের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।

রোববার রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পুতিন বলেন, ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ অব্যাহত রাখবে মস্কো। তাঁর দাবি, ইউক্রেনের সেনারা দীর্ঘ ফ্রন্টলাইনে চাপের মুখে পড়েছে বলেই দূরপাল্লার হামলা বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছে।

পুতিন বলেন, “তারা কেন এই প্রস্তাব দিয়েছে তা স্পষ্ট। কারণ, ইউক্রেনের ভেতরে আমাদের পাল্টা হামলা অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেশি। রাখঢাক না করে বলতে গেলে, তা আরও বেশি ধ্বংসাত্মক।”

তিনি আরও বলেন, “সেনাসংকটে পড়ে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী হয়তো এটাকেই বাঁচার উপায় মনে করছে। কিন্তু কিয়েভ সরকারকে রক্ষা করা আমাদের পরিকল্পনার অংশ নয়।”

তবে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ এখনো পুতিনের এই বক্তব্যের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। একই সঙ্গে কিয়েভ সত্যিই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধের কোনো প্রস্তাব দিয়েছে কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট কিছু জানায়নি।

ইউক্রেনের প্রস্তাবের পেছনে রণক্ষেত্রের চাপ?

পুতিনের বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডের ভেতরে জ্বালানি স্থাপনাসহ বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেছেন, রাশিয়ার তেলশিল্পে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার কারণে মস্কোকে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হয়েছে।

তবে তিনি দাবি করেন, এসব হামলা যুদ্ধক্ষেত্রের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না।

পুতিন বলেন, “তারা আমাদের অবকাঠামোর যেখানেই আঘাত করুক না কেন, তা সম্মুখযুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না।”

তাঁর দাবি, ইউক্রেনের লক্ষ্য হচ্ছে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করা এবং পর্যটন মৌসুমে সমস্যার সৃষ্টি করা।

রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলা

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রোববার জানান, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

এসবের মধ্যে একটি হলো রাশিয়ার স্লাভিয়ানস্ক তেল শোধনাগার এবং অন্যটি ইয়ারোস্লাভল তেল শোধনাগার। এগুলো সম্মুখযুদ্ধক্ষেত্র থেকে যথাক্রমে প্রায় ৩০০ ও ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধ করার সক্ষমতা কমাতে ইউক্রেনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, প্রতিটি হামলার অর্থ হচ্ছে রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতা কমে যাওয়া।

রুশ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ক্রাসনোদর অঞ্চলের স্লাভিয়ানস্ক-না-কুবানিতে একটি তেল শোধনাগারে হামলার পর আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায় কয়েকটি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একজন নিহত হয়েছেন।

ইয়ারোস্লাভল অঞ্চলের গভর্নর মিখাইল ইয়েভরায়েভ জানান, ওই অঞ্চলও ইউক্রেনের ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে ইয়ারোস্লাভল শহর থেকে বের হওয়ার কিছু পথ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

রাশিয়ার বার্তা সংস্থা তাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বেলগোরোদ অঞ্চলের শেবেকিনস্কি জেলায় ইউক্রেনের ৬৪টি ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন।

বেলগোরোদ অঞ্চলের গভর্নর আলেক্সান্দার খিনশ্তেইন জানান, রুশ বাহিনী ১১৭টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। তাঁর দাবি, ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো কয়েক দফায় রুশ ভূখণ্ডে বিস্ফোরক ফেলেছে।

পাল্টা হামলায় ইউক্রেনেও হতাহত

রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনেও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, রোববার রুশ হামলায় ইউক্রেনে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিজঝিয়া শহরের এবং দুজন উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ শহরের বাসিন্দা।

কেন সমঝোতায় রাজি নন পুতিন?

বিশ্লেষকদের মতে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় রাশিয়া ইউক্রেনের তুলনায় এগিয়ে থাকায় মস্কো এই সুবিধা হারাতে চাইছে না।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটসের ফেলো ইয়ান লেসার আল–জাজিরাকে বলেন, রাশিয়ার দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা একটি বড় কৌশলগত সুবিধা।

তিনি বলেন, “দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতায় রাশিয়া অনেক এগিয়ে। তাই পুতিন এই সুবিধা হাতছাড়া করতে চাইবেন না—এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে অন্তত এই সময়ে তিনি কোনো ধরনের সমঝোতায় যাবেন না।”

লেসারের মতে, রাশিয়া মনে করছে দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা ধরে রাখা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করছে।

আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারে মনোযোগ মস্কোর

পুতিন জানান, রাশিয়ার বর্তমান অগ্রাধিকার হলো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো।

তিনি বলেন, ইউক্রেনের ড্রোন হামলা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বাড়লেও রাশিয়ার সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এখনো দেখা যায়নি। অন্যদিকে, ইউক্রেন এসব হামলার মাধ্যমে রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরির চেষ্টা করছে।

চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে উভয় পক্ষই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার সীমিত করার বিষয়ে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় সংঘাতের অবসানের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স