ঢাকা

কেন ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমানোর প্রস্তাব মানলেন না পুতিন: আল–জাজিরার বিশ্লেষণ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আল–জাজিরা | প্রতিবেদন

ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সঙ্গে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সীমিত করা এবং সংঘাত কমানোর বিষয়ে ইউক্রেনের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোববার পুতিন বলেন, ইউক্রেন শান্তির পথে এগোনোর অংশ হিসেবে উভয় পক্ষের দূরপাল্লার হামলা বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে তাঁর দাবি, প্রায় ১ হাজার ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ সম্মুখযুদ্ধের রেখায় (ফ্রন্টলাইন) ইউক্রেনীয় বাহিনী চাপের মুখে পড়ায় কিয়েভ এই প্রস্তাব দিয়েছে।

পুতিন বলেন, “তারা কেন এই প্রস্তাব দিয়েছে তা স্পষ্ট। কারণ, ইউক্রেনের ভেতরে আমাদের পাল্টা হামলা অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেশি। রাখঢাক না করে বলতে গেলে, তা আরও বেশি ধ্বংসাত্মক।”

তিনি আরও বলেন, “সেনাসংকটে পড়ে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী হয়তো এটাকেই বাঁচার উপায় মনে করছে। কিন্তু কিয়েভ সরকারকে রক্ষা করা আমাদের পরিকল্পনার অংশ নয়।”

তবে পুতিনের এই বক্তব্যের বিষয়ে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। এমনকি কিয়েভ সত্যিই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধের কোনো প্রস্তাব দিয়েছে কি না, সে বিষয়েও তারা প্রকাশ্যে কিছু বলেনি।

জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বাড়াচ্ছে ইউক্রেন

পুতিনের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডের ভেতরে জ্বালানি স্থাপনাসহ বিভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেছেন, রাশিয়ার তেলশিল্পকে লক্ষ্য করে ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলা মোকাবিলায় মস্কোকে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হয়েছে।

তবে তিনি দাবি করেন, এসব হামলা যুদ্ধের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে কোনো বড় পরিবর্তন আনতে পারবে না।

পুতিন বলেন, “তারা আমাদের অবকাঠামোর যেখানেই আঘাত করুক না কেন, তা সম্মুখযুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না।”

তাঁর দাবি, ইউক্রেনের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করা এবং পর্যটন মৌসুমে সমস্যা সৃষ্টি করা।

রোববার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার স্লাভিয়ানস্ক ও ইয়ারোস্লাভল তেল শোধনাগারে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

এই দুটি তেল শোধনাগার সম্মুখযুদ্ধের এলাকা থেকে যথাক্রমে প্রায় ৩০০ ও ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে ইউক্রেনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, প্রতিটি হামলার অর্থ হচ্ছে রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ ও সক্ষমতা কমে যাওয়া।

রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ড্রোন হামলা

রাশিয়ার ক্রাসনোদর অঞ্চলের গভর্নর টেলিগ্রামে জানান, স্লাভিয়ানস্ক-না-কুবানির একটি তেল শোধনাগারে হামলার পর আগুন ধরে যায়। এ ঘটনায় কয়েকটি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একজন নিহত হয়েছেন।

রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়ার পূর্ব পাশে অবস্থিত এই অঞ্চলে ইউক্রেনের হামলা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।

গত কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেন রাশিয়ার একাধিক জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। গত সপ্তাহেও ক্রিমিয়া ও ক্রাসনোদরের দুটি জ্বালানি কেন্দ্রে দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করা হয়। এসব স্থাপনা থেকে সম্মুখযুদ্ধক্ষেত্রে থাকা রুশ সেনাদের জন্য জ্বালানি সরবরাহ করা হতো।

এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার কারণে ক্রিমিয়ায় জ্বালানি বিক্রিতেও প্রভাব পড়ে।

ইয়ারোস্লাভল অঞ্চলের গভর্নর মিখাইল ইয়েভরায়েভ জানান, মস্কোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই এলাকাও ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে ইয়ারোস্লাভল শহর থেকে বের হওয়ার কয়েকটি পথ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।

রুশ বার্তা সংস্থা তাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইউক্রেন বেলগোরোদ অঞ্চলের শেবেকিনস্কি জেলায় ৬৪টি ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এতে একজন নিহত হয়েছেন।

বেলগোরোদ অঞ্চলটি ইউক্রেনের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের কাছে অবস্থিত।

পাশের কুরস্ক অঞ্চলের গভর্নর আলেক্সান্দার খিনশ্তেইন দাবি করেন, রুশ সেনারা বিভিন্ন ধরনের ১১৭টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো অন্তত সাতবার রুশ ভূখণ্ডে বিস্ফোরক ফেলেছে।

অন্যদিকে, স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রোববার রুশ হামলায় ইউক্রেনে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া শহরের এবং দুজন উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ শহরের বাসিন্দা।

কেন দূরপাল্লার হামলা সীমিত করতে চাইছেন না পুতিন?

বিশ্লেষকদের মতে, দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতায় রাশিয়া ইউক্রেনের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। ফলে এই সামরিক সুবিধা ছাড়তে মস্কো আগ্রহী নয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটসের ফেলো ইয়ান লেসার আল–জাজিরাকে বলেন, রাশিয়ার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা একটি বড় কৌশলগত সুবিধা।

তিনি বলেন, “দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতায় রাশিয়া অনেক এগিয়ে। তাই পুতিন এই সুবিধা হাতছাড়া করতে চাইবেন না—এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে অন্তত এই সময়ে তিনি কোনো ধরনের সমঝোতায় যাবেন না।”

লেসারের মতে, মস্কো মনে করছে দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা ধরে রাখা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা বজায় রাখছে।

আকাশ প্রতিরক্ষা বাড়াচ্ছে মস্কো

পুতিন জানিয়েছেন, রাশিয়ার বর্তমান অগ্রাধিকার হলো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো।

তিনি বলেন, ইউক্রেনের ড্রোন হামলা মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে ইউক্রেনের হামলা মস্কোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও তা এখনো যুদ্ধের গতিপথে বড় পরিবর্তন আনেনি।

অন্যদিকে, ইউক্রেন এসব হামলার মাধ্যমে রাশিয়ার সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও যুদ্ধ পরিচালনার অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে।

দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহারে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় চলমান যুদ্ধের অবসানের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স