ঢাকা

বাজেট প্রত্যাখ্যানের ব্যাখ্যায় বিরোধী দল: অস্বচ্ছ ও বাস্তবায়ন অযোগ্য

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ‘অপরিকল্পিত, অস্বচ্ছ ও অবাস্তবায়নযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছে বিরোধী দল। তবে সংসদে বিরোধী দলের চাপ ও আপত্তির কারণে বাজেটের কয়েকটি ‘গণবিরোধী’ প্রস্তাব সরকার সংশোধন বা প্রত্যাহার করেছে বলে দাবি করেছে তারা।

মঙ্গলবার (১ জুলাই ২০২৬) জাতীয় সংসদে বাজেট পাস হওয়ার পর সংসদ ভবন চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও সংসদে বিরোধী দলের মুখপাত্র মো. নাজিবুর রহমান।

তিনি বলেন, বিরোধী দল শুরু থেকেই জনগণের স্বার্থে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের চেষ্টা করেছে। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় বাজেটের মূল সমস্যাগুলো সমাধান হয়নি বলেই তারা ‘না’ ভোট দিয়েছে।

নাজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিরোধী দল হিসেবে প্রথম থেকেই জনগণের স্বার্থে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি। আমরা বাজেটে না ভোট দিয়েছি। কারণ এক কথায় বলতে গেলে, এই বাজেটটি অপরিকল্পিত, অস্বচ্ছ এবং অবাস্তবায়নযোগ্য। তবে আমাদের জোরালো ভূমিকার কারণে সরকার বাজেটের কিছু গণবিরোধী বিষয় সংশোধন করেছে।’

বিরোধীদের দাবিতে কয়েকটি সংশোধন হয়েছে: নাজিবুর রহমান

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের আপত্তির পর বাজেটের কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী—

মুদিদোকানের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আবাসন খাতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল করা হয়েছে।
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের একটি বিতর্কিত বিধান বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

নাজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা দেখেছি, আমাদের কিছু ন্যায্য দাবি সরকার মেনে নিয়েছে এবং সংশোধন করেছে। কিন্তু তারপরও বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা রয়ে গেছে।’

ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনার সমালোচনা

বিরোধী দলের মুখপাত্র বাজেটে সরকারের ব্যাংকঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, একদিকে সরকার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, অন্যদিকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ ও টাকা ছাপানোর নীতির দিকে যাচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নাজিবুর রহমান বলেন, ‘সব অর্থনীতিবিদই বলছেন, ব্যাংকিং খাত ভঙ্গুর। সরকার টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে সহায়তা দিচ্ছে। তাহলে এই ব্যাংকগুলো থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ কীভাবে নেওয়া হবে, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।’

তিনি বলেন, কয়েকটি ইতিবাচক সংশোধন হলেও বাজেটের মৌলিক সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। এ কারণেই বিরোধী দল বাজেটের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে।

বিল উত্থাপনের প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ

সংসদে বিভিন্ন বিল উত্থাপনের প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিরোধী দল।

তাদের অভিযোগ, সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কোনো বিল উত্থাপনের অন্তত তিন দিন আগে সদস্যদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে যেদিন বিল উত্থাপন করা হয়, সেদিনই তা সরবরাহ করা হচ্ছে।

এর ফলে সংসদ সদস্যরা পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পাচ্ছেন না বলে দাবি করেছে বিরোধী দল।

তবে নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইনকে যুগোপযোগী উল্লেখ করে সেটিকে স্বাগত জানিয়েছে তারা।

জুয়া প্রতিরোধ আইন নিয়ে আপত্তি

বিরোধী দল জানায়, জুয়া প্রতিরোধ আইনটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। তবে আইনটিতে পুলিশকে আদালতের অনুমতি ছাড়া কম্পিউটার ও সার্ভার জব্দ করার যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেটি নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।

তাদের মতে, এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করার বিধান রাখা উচিত ছিল।

মেডিক্যাল শিক্ষা বিল নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশ মেডিক্যাল শিক্ষা-সংক্রান্ত বিল নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিরোধী দল।

তাদের বক্তব্য, এটি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন। কিন্তু উচ্চশিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণের আশঙ্কা থাকায় বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে আরও পর্যালোচনার পর বিলটি সংসদে আনা উচিত ছিল।

সংবিধান সংশোধন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গ

সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে বিরোধী দল বলেছে, শুধু সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এর জন্য সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিসহ বিভিন্ন আইন ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

তারা জানিয়েছে, এ বিষয়ে দুই সরকারি দলের পাঁচজন এবং বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্য নিয়ে একটি সংস্কার কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকার এখনো এতে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আলাদা বরাদ্দ নেই: অভিযোগ

বিরোধী দলের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনের বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে কার্যকর কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।

তাদের দাবি, নিহত ও আহত ব্যক্তিদের জন্য অনুদানের অর্থ ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কোনো পৃথক বাজেট বা নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা রাখা হয়নি।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বাজেটে আরও স্বচ্ছতা, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কৌশল থাকা প্রয়োজন ছিল।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স