বিবিসি অবলম্বনে
ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তরমন্তরে চলছে এক ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ। তীব্র গরম, মাথার ওপর গনগনে রোদ আর ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রার মধ্যেও কয়েক শ তরুণ-তরুণী দিনরাত অবস্থান করছেন সেখানে। নিজেদের ‘তেলাপোকা’ পরিচয় দিয়ে তাঁরা দাবি তুলেছেন, ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে।
আঠারো শতকে নির্মিত যন্তরমন্তর দিল্লির অন্যতম পরিচিত প্রতিবাদস্থল। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠা এই স্থাপনাতেই এখন অবস্থান নিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলনের সদস্যরা।
ভারী হলুদ রঙের ধাতব ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ঘিরে রেখেছে দিল্লি পুলিশ। নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন। এর মধ্যেই আন্দোলনের নেতারা পালাক্রমে মাইক্রোফোনে বক্তব্য দিচ্ছেন, চলছে স্লোগান, গান এবং প্রতিবাদী কর্মসূচি।
নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলন
ভারতে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য নেওয়া জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট-ইউজি) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের নৈতিক দায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ওপর বর্তায়। তাই তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে।
চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর নিট-ইউজি পরীক্ষা বাতিল করা হয়। পরে সরকার আবার পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হওয়া ক্ষোভ পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
গত ২১ জুন ভারত সরকার পুনরায় নিট-ইউজি পরীক্ষা গ্রহণ করলেও যন্তরমন্তরে চলমান বিক্ষোভে তার খুব বেশি প্রভাব পড়েনি।
‘তেলাপোকা’ নামের পেছনের গল্প
ককরোচ জনতা পার্টির নামের পেছনে রয়েছে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক বক্তব্যে বেকার তরুণ, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। মন্তব্যটি প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
পরে প্রধান বিচারপতি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি সাধারণ তরুণদের নয়, বরং ‘ভুয়া ও জাল ডিগ্রিধারী’ ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে ওই মন্তব্য করেছিলেন। তবে এতে ক্ষোভ কমেনি।
এই ঘটনার পর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভারতীয় তরুণ অভিজিৎ দীপকে অনলাইনে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) গড়ে তোলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ তখন ভারতে অবস্থান করছিলেন।
তিনি বিবিসিকে বলেন, প্রধান বিচারপতির মন্তব্য দেখে তিনি হতাশ ও বিস্মিত হয়েছিলেন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি একটি পোস্ট দেন—“যদি সব তেলাপোকা একসঙ্গে হয়ে যায়, তাহলে কী হবে?”
পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই সেখানে নিজেদের একটি প্ল্যাটফর্ম বা সংগঠন গড়ে তোলার কথা বলেন।
অভিজিৎ বলেন, “শুরুতে এটি শুধু ব্যঙ্গধর্মী একটি উদ্যোগ ছিল। কিন্তু লাখ লাখ মানুষ যুক্ত হতে শুরু করলে অনেকে এটিকে বড় আন্দোলনে পরিণত করার কথা বলেন। কারণ অন্য কোনো রাজনৈতিক দল আমাদের চাহিদা, আশা বা আকাঙ্ক্ষার কথা বলছে না।”
মিম থেকে আন্দোলনে রূপ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অভিজিৎ একটি লোগো ও মাসকট তৈরি করেন—স্যুট পরা একটি তেলাপোকা। ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর নামকে ব্যঙ্গ করে রাখা হয় সংগঠনের নাম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
শুরুতে এটি ছিল অনলাইনভিত্তিক ব্যঙ্গ ও রসিকতার জায়গা। কিন্তু ধীরে ধীরে তরুণদের চাকরির সংকট, পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বিভিন্ন উদ্বেগ প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
অভিজিৎ বলেন, “বছরের পর বছর ধরে আমরা দেখছি একের পর এক পরীক্ষা বাতিল হচ্ছে। কিন্তু ব্যবস্থার ত্রুটি দূর করতে বা দায় স্বীকার করতে কেউ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।”
তাঁর পোস্ট কয়েক লাখবার দেখা হয় এবং বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
দেশে ফেরার পর গ্রেপ্তারের আশঙ্কা ছিল
বোস্টন থেকে ভারতে ফিরে সরাসরি আন্দোলনে যোগ দেন অভিজিৎ। তিনি ভেবেছিলেন, বিমানবন্দর থেকেই হয়তো তাঁকে আটক করা হবে।
তিনি বলেন, “বিমানবন্দর থেকে আমাকে বের হতে দেওয়া হবে, এমনটা আমি নিজেও ভাবিনি। আমি ভেবেছিলাম, আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে।”
ভারতে পৌঁছানোর পর পুলিশ তাঁর বিমানের আসনের কাছে যায়। তবে তাঁকে আটক করা হয়নি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি যন্তরমন্তরে পৌঁছে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
গত ৬ জুন প্রথম যন্তরমন্তরে বিক্ষোভ শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি। এরপর ভারতের ছয়টির বেশি শহরে তারা কর্মসূচি পালন করেছে।
অনশনে সোনম ওয়াংচুক
আন্দোলনে নতুন গতি আসে হিমালয় অঞ্চলের পরিচিত জলবায়ুকর্মী সোনম ওয়াংচুক যোগ দেওয়ার পর।
গত রোববার থেকে তিনি যন্তরমন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন।
৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মধ্যে কত দিন অনশন চালিয়ে যাবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়াংচুক বলেন, “দিনের কেবল শুরু, তাই কোনো সমস্যা নেই। তবে আমি স্বাস্থ্য নিয়ে খুব বেশি ভাবি না। হয় মৃত্যু, না হয় অনির্দিষ্টকাল ধরে অনশন চলবে।”
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
ককরোচ জনতা পার্টির দাবি, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ করা উচিত।
তবে শিক্ষামন্ত্রী এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ককরোচ জনতা পার্টি ও এর সমর্থকেরা ‘বিভ্রান্তিকর শক্তির বি-টিম’। তাঁর দাবি, দেশের অগ্রগতির ওপর তাদের আস্থা নেই।
অভিজিৎ বলেন, “সরকার যদি অনড় থাকে, তাহলে আমরাও আরও বেশি অনড় হব।”
বিক্ষোভস্থলে নিয়মিত শোনা যাচ্ছে—“প্রধান গো ব্যাক” স্লোগান।
নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে দেয়াল
যন্তরমন্তরের বিক্ষোভস্থলে একটি হলুদ ত্রিপলের নিচে তৈরি করা হয়েছে স্মরণদেয়াল। সেখানে নিট-ইউজি পরীক্ষা বাতিলের পর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের নাম ও ছবি রাখা হয়েছে।
সেখানে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের ১৪ শিক্ষার্থীর ছবি রয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র সৌরভ দাস দাবি করেছেন, এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০ জনে দাঁড়িয়েছে।
ছবিগুলোর নিচে লেখা রয়েছে বিভিন্ন বার্তা। একটি বার্তায় লেখা—“আমরা না লড়লে কে লড়বে? আমরা না বললে কে বলবে?”
স্কুলশিক্ষক শীতল চৌধুরী বলেন, এসব শিক্ষার্থী দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের সন্তান ছিলেন। অনেকেই পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ঋণ নিয়েছিলেন।
স্নাতক শিক্ষার্থী তামান্না কুমারী বলেন, তিনি পুলিশে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর আশঙ্কা, নিয়োগ পরীক্ষাতেও যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, তাহলে তাঁর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের ঘোষণা
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে যন্তরমন্তরে ভিড় বাড়তে থাকে। আয়োজকেরা বলছেন, আন্দোলনের প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়ছে। অনেকেই খাবার ও পানি পাঠাচ্ছেন।
সৌরভ দাস বলেন, “শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ আমাদের একটি লড়াই। কিন্তু এটি শুধু কয়েক দিন বা কয়েক মাসের বিষয় নয়। আমরা একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘমেয়াদি লড়াই করছি।”
তবে ককরোচ জনতা পার্টি এখনো কোনো রাজনৈতিক দল নয়। অনলাইনে বিপুল সমর্থন থাকলেও মাঠপর্যায়ে এই আন্দোলন কতটা বড় রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কিন্তু ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যেও যন্তরমন্তরে অবস্থান নেওয়া এই তরুণদের বার্তা স্পষ্ট—পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি থেকে তারা সরে আসতে প্রস্তুত নয়।