ঢাকা

‘দেশের জন্য প্রত্যাশামতো অর্জন করতে পারিনি’—জন্মদিনে মাহাথির মোহাম্মদ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রধান রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ আজ শুক্রবার ১০১ বছরে পা রেখেছেন। শতবর্ষ পেরিয়েও দেশ, রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর চিন্তা থেমে নেই। জন্মদিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, মালয়েশিয়ার জন্য তাঁর প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি এবং তিনি মনে করেন, দেশের জন্য আরও অনেক কিছু করা সম্ভব ছিল।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম মালয়েশিয়া নাউ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাহাথির বলেন, উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সব ধরনের সম্ভাবনা মালয়েশিয়ার রয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার ব্যর্থ হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।

‘দেশের জন্য আমি অনেক কিছুই অর্জন করতে পারিনি’

নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে মাহাথির বলেন,

“দেশের জন্য আমি অনেক কিছুই অর্জন করতে পারিনি। আমি মনে করি, আমাদের একটি উন্নত জাতি হয়ে ওঠার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর জন্য সময়, মেধা এবং সঠিক ধারণার প্রয়োজন।”

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার উন্নয়নের জন্য যে সুযোগগুলো রয়েছে, সেগুলো বর্তমান সরকার হয় দেখতে পাচ্ছে না, অথবা দেখলেও সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, সে বিষয়ে তাদের যথাযথ পরিকল্পনা নেই।

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার

১৯৫৭ সালে স্বাধীনতার পর মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত রূপান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ।

তিনি প্রথম দফায় ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর এবং পরে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুই মেয়াদ মিলিয়ে প্রায় ২৪ বছর দেশটির সরকারপ্রধান ছিলেন তিনি।

তাঁর নেতৃত্বে মালয়েশিয়ায় শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি খাতের প্রসার এবং অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এ কারণেই তাঁকে আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতিদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

‘এখন নিজের জন্য ভাবার সময় নেই’

সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক শামসুল আকমার জানতে চান, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি কী নিয়ে ভাবেন।

জবাবে মাহাথির বলেন,

“হ্যাঁ, আমি এসব নিয়েই ভাবি। আর কী নিয়েই বা ভাবব? নিজের জন্য ভাবার সময় শেষ। এখন যা ভাবার, সবই দেশের জন্য।”

তিনি আরও বলেন, মালয় জনগণের অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আট দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগ্রাম করে আসছেন।

তাঁর ভাষায়,

“মালয়দের জন্য সংগ্রামে আমি ৮০ বছরের বেশি সময় পার করেছি। আমি অন্যদের বা অ-মালয়দের অধিকারও স্বীকার করি। তবে মালয়দের ভূমি হিসেবেই আমাদের দেশের উৎপত্তি।”

বর্তমান সরকারের সমালোচনায় সরব

ক্ষমতা ছাড়ার পরও মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে মাহাথির মোহাম্মদের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে তিনি নিয়মিত মতামত দিয়ে আসছেন এবং প্রায়ই বর্তমান সরকারের সমালোচনা করছেন।

গত বছরের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের পদত্যাগ দাবিতে অনুষ্ঠিত একটি বিক্ষোভেও অংশ নেন তিনি।

ওই বিক্ষোভে সরকারের বিরুদ্ধে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

মালয়দের ঐক্যের ওপর জোর

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাহাথির সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মালয় জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ঐক্যের প্রশ্নে।

সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেন, মালয় সমাজের মধ্যে বিভক্তি ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

সম্প্রতি তিনি জাতিগত মালয় ভোটারদের প্রতি শুধু মালয় প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর এই বক্তব্য মালয়েশিয়ার বহুজাতিক সমাজে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।

সমালোচকদের মতে, এমন বক্তব্য দেশের বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে মাহাথির বরাবরের মতোই মালয়দের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

শতবর্ষ পেরিয়েও রাজনীতিতে সক্রিয়

১০১ বছর বয়সেও মাহাথির মোহাম্মদ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক ইস্যু নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি এখনো মালয়েশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, শতবর্ষ অতিক্রম করেও মাহাথিরের রাজনৈতিক উপস্থিতি ও বক্তব্য মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে এখনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে এবং জাতীয় বিভিন্ন বিতর্কে তাঁর মতামত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স