জুলাই গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, বর্তমানে দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বিঘ্নে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে। এসব অর্জন জুলাই গণ-আন্দোলনের ফল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
মঙ্গলবার ‘জুলাই শহীদ’ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।
বিবৃতিতে শফিকুর রহমান বলেন, ১৬ জুলাই জাতীয় ইতিহাসের একদিকে যেমন গৌরবময়, অন্যদিকে তেমনি বেদনাবিধুর একটি দিন। বৈষম্য, জুলুম-নির্যাতন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান তিনি। একই সঙ্গে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহত ব্যক্তি ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনাও প্রকাশ করেন।
‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এসেছে জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে’
বিবৃতিতে জামায়াত আমির বলেন, জুলাই গণ-আন্দোলনের কারণে দেশের মানুষ আজ মুক্ত ও স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারছে। রাজনৈতিক দলগুলোও বাধাহীনভাবে তাদের কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুযোগ পাচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, এসবই জুলাই গণ-আন্দোলনের গৌরবময় অর্জন।
আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়
শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। তাঁর দাবি, ওই ঘটনার পর আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে তা একটি সর্বজনীন গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়।
তিনি বলেন, এই আন্দোলনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, তরুণ-তরুণী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ একই দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসেন। পরবর্তীতে আন্দোলন সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়।
আন্দোলন দমনে নির্বিচার শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ
বিবৃতিতে শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, আন্দোলন দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবির একটি অংশের গুলিতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত হন। এছাড়া কয়েক হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
এসব মন্তব্য জামায়াতে ইসলামীর আমিরের নিজস্ব রাজনৈতিক বক্তব্য ও দাবি হিসেবে বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে।
‘গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে’
শফিকুর রহমান আরও বলেন, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তিনি দাবি করেন, সরকার পতন নিশ্চিত হওয়ার পর শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন।
তাঁর মতে, এর মাধ্যমে দেশের মানুষ স্বৈরাচারী শাসন এবং বিদেশি প্রভাব থেকে মুক্তি লাভ করে।
‘শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না’
বিবৃতিতে জামায়াত আমির বলেন, জুলাই গণ-আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ জাতিকে চিরদিন ঋণী করে রাখবে।
তিনি বলেন, “আমরা তাঁদের কাছে চিরঋণী। আজ আমাদের শপথ নিতে হবে, শহীদদের এই রক্ত যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়। একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, ন্যায়বিচারভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমেই তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি যথার্থ সম্মান জানানো সম্ভব।”
‘জুলাই শহীদ’ দিবস পালনের আহ্বান
বিবৃতির শেষাংশে শফিকুর রহমান ১৬ জুলাই ‘জুলাই শহীদ’ দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের জন্য দলের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, দিবসটি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল এবং শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে তাঁদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করা উচিত।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দেওয়া এই বিবৃতিতে জুলাই গণ-আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ, আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে দলটির অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে দলটি গণতান্ত্রিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।