ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে গত দুই সপ্তাহে প্রায় ১০০ মার্কিন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন বলে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর (পেন্টাগন)। তবে আহতদের অধিকাংশই সামান্য মাত্রার মস্তিষ্কে আঘাত (কনকাশন) পেয়েছেন এবং তাঁদের প্রায় সবাই ইতোমধ্যে দায়িত্বে ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সহকারী শন পার্নেল। একই তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও ইউএসএ টুডে।
শন পার্নেল জানান, ৭ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ সেনাসদস্য কোনো না কোনো ধরনের আঘাত পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বড় অংশই কনকাশন বা সামান্য মস্তিষ্কে আঘাতে আক্রান্ত হয়েছেন। আহতদের ৯৬ শতাংশ ইতোমধ্যে চিকিৎসা শেষে নিজ নিজ দায়িত্বে ফিরে গেছেন।
তবে এসব সেনা কীভাবে, কোথায় বা কোন হামলায় আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি পেন্টাগন।
আহতের তথ্য গোপনের অভিযোগ অস্বীকার
মার্কিন সংবাদপত্র দ্য নিউইয়র্ক টাইমস সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করে, ইরানের হামলায় আহত মার্কিন সেনাদের প্রকৃত সংখ্যা পেন্টাগন জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি।
এই অভিযোগের কঠোর জবাব দিয়ে শন পার্নেল বলেন, আহত সেনাদের সংখ্যা গোপন রাখার অভিযোগ "ভিত্তিহীন, বিদ্বেষমূলক এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা"।
এক্সে দেওয়া পৃথক এক পোস্টে তিনি লেখেন, "নিউইয়র্ক টাইমসের কিছু পক্ষপাতদুষ্ট লেখক মার্কিন সামরিক বাহিনী ও এর নেতৃত্বকে কালিমালিপ্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।"
তিনি আরও বলেন, আহত সেনাদের মনোবল অটুট রয়েছে এবং তাঁরা আবারও দায়িত্ব পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
নিউইয়র্ক টাইমসের পাল্টা বক্তব্য
পেন্টাগনের এই বক্তব্যের পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
পত্রিকাটির মুখপাত্র ড্যানিয়েল রোডস হা এক বিবৃতিতে বলেন, তাঁদের প্রতিবেদনের নির্ভুলতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী।
তিনি বলেন, অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইরানের একাধিক হামলায় মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের তথ্য পেন্টাগন প্রকাশ করেনি।
রোডস হা আরও বলেন, প্রতিবেদনটি মার্কিন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে, যাঁরা নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
তাঁর ভাষায়, "এ ধরনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জনগণকে তাদের সরকার কীভাবে কাজ করছে, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানার সুযোগ করে দেয়।"
নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে ১৭
পেন্টাগনের সর্বশেষ এই স্বীকারোক্তি এমন সময় এলো, যখন এর মাত্র এক দিন আগে জর্ডানে ইরানি হামলায় আরও দুই মার্কিন সেনার নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়।
এর ফলে গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে নিহত মার্কিন সামরিক সদস্যের সংখ্যা বেড়ে ১৭ জনে দাঁড়িয়েছে।
সর্বশেষ নিহত দুই সেনা হলেন—
ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান (২৫), হাওয়াইয়ের ইভা বিচ এলাকার বাসিন্দা।
প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেস (১৯), টেক্সাসের ক্যারলটনের বাসিন্দা।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
গত ১৯ জুলাই জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিহত দুই সেনার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
তিনি বলেন, "ওই মহান দেশপ্রেমিকেরা সেখানে লড়াই করছিলেন, যাতে ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে।"
এর আগে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, কোনো মার্কিন সেনা নিহত হলে ইরানকে তার ‘বহুগুণ মূল্য’ দিতে হবে।
যুদ্ধের মানবিক মূল্য নিয়ে নতুন আলোচনা
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে মার্কিন সেনাদের হতাহত হওয়ার সংখ্যা নিয়ে এতদিন নানা জল্পনা চলছিল। পেন্টাগনের সর্বশেষ স্বীকারোক্তির পর স্পষ্ট হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি সরকারি হিসাবের তুলনায় আরও বেশি হতে পারে—এমন বিতর্ক এখন আরও জোরালো হয়েছে।
একদিকে পেন্টাগন আহত সেনাদের বেশির ভাগই সুস্থ হয়ে দায়িত্বে ফেরার কথা বলছে, অন্যদিকে নিউইয়র্ক টাইমস দাবি করছে, ইরানের বিভিন্ন হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে যুদ্ধের প্রকৃত মানবিক মূল্য এবং সরকারি তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম পর্যায়ে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আভাস মিলছে।