ঢাকা

জাতিসংঘে চিঠি লেখার জেরে মামলা, মুসলিম কর্মকর্তাদের বৈষম্যের অভিযোগ মহুয়া মৈত্রের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ সফরের সময় মুসলিম ধর্মাবলম্বী তিন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাকে সরকারি বৈঠক ও প্রটোকল-সংক্রান্ত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র। তাঁর দাবি, কর্মকর্তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই তাঁদের সরকারি কর্মসূচি থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।

এ অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করার পর মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয়। পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে ডায়মন্ড হারবার সাইবার ক্রাইম পুলিশ। পুলিশ সূত্রের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, তাঁর একটি পোস্ট সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি করা হয়েছে।

এর মধ্যেই বিষয়টি জাতিসংঘের নজরে এনেছেন কৃষ্ণনগরের এই তৃণমূল সংসদ সদস্য। তিনি জাতিসংঘের সংখ্যালঘুবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার অধ্যাপক নিকোলাস লেভরাটকে চিঠি দিয়ে অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ সফর ঘিরে কথিত ঘটনাগুলো তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে মহুয়া মৈত্রের অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিন কর্মকর্তাকে ঘিরে অভিযোগ

মহুয়া মৈত্র তাঁর চিঠিতে তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেন—শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার সৈয়দ ওয়াকার রাজা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্সের প্রধান জাভেদ শামিম এবং জ্যেষ্ঠ আইএএস কর্মকর্তা খলিল আহমেদ।

মহুয়ার দাবি, জুলাই ও আগস্টে অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ সফরের সময় তিনটি পৃথক ঘটনায় তাঁদের সরকারি কর্মসূচি থেকে দূরে রাখা হয়। কারও ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়, আবার কাউকে বৈঠক থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

মহুয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গ সফরের সময় অমিত শাহকে স্বাগত জানাতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের যে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনার ওয়াকার রাজাকে রাখা হয়নি। জাভেদ শামিমকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলেও দাবি করেছেন তিনি।

অন্যদিকে খলিল আহমেদকে একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি বৈঠক থেকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়েছিল বলে চিঠিতে অভিযোগ করেছেন মহুয়া।

তাঁর বক্তব্য, একই ধরনের দায়িত্বে থাকা অন্য ধর্মের কর্মকর্তারা যখন সরকারি অনুষ্ঠান ও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, তখন ওই তিন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ করা হয়েছে। এই পার্থক্যের কারণ হিসেবে তাঁদের ধর্মীয় পরিচয়কেই উল্লেখ করেছেন তিনি।

১ সেপ্টেম্বর এক্সে অভিযোগ

জাতিসংঘে চিঠি পাঠানোর আগে ১ সেপ্টেম্বর এক্সে একটি পোস্ট দিয়ে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন মহুয়া মৈত্র। ওই পোস্টে তিনি মুসলিম কর্মকর্তাদের অমিত শাহের সফরের সরকারি কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ করেন।

পোস্টে তিনি ওয়াকার রাজা, জাভেদ শামিম ও খলিল আহমেদের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, অমিত শাহের উপস্থিতি থাকলে মুসলিম কর্মকর্তাদের সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হয়েছে।

এই পোস্টের পরই ডায়মন্ড হারবার এলাকায় তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করা হয়। পুলিশ সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অভিযোগকারী দাবি করেন, মহুয়ার পোস্ট সাম্প্রদায়িক বিরোধ বা উত্তেজনা উসকে দিতে পারে। পরে তাঁকে সাইবার ক্রাইম পুলিশের সামনে হাজির হয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য সমন পাঠানো হয়।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৯৬, ১৯৭, ২৯৯ ও ৩৫৩ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব ধারার মধ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা উসকে দেওয়া, জাতীয় সংহতির পরিপন্থী কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং জনমনে বিভ্রান্তি বা ক্ষতির কারণ হতে পারে—এমন বক্তব্যসংক্রান্ত বিধান রয়েছে।

এবার জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ারের দ্বারস্থ

পুলিশি মামলার মধ্যেই মহুয়া মৈত্র তাঁর অভিযোগ নিয়ে জাতিসংঘের সংখ্যালঘুবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামোয় ‘স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার অন মাইনরিটি ইস্যুজ’ পদটির দায়িত্ব জাতীয়, জাতিগত, ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকার-সংক্রান্ত বিষয় পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন করা। জাতিসংঘের বর্তমান তালিকায় এ দায়িত্বে রয়েছেন সুইজারল্যান্ডের অধ্যাপক নিকোলাস লেভরাট।

মহুয়া তাঁর চিঠিতে বলেছেন, অমিত শাহের জুলাই ও আগস্টের সফরকালে তিনজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তিনটি পৃথক ঘটনায় সরকারি দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করছেন।

তাঁর দাবি, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং একই ধরনের আচরণের ধারাবাহিকতা রয়েছে। এই কারণে তিনি বিষয়টি জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ারের নজরে আনতে চেয়েছেন।

‘ধর্মীয় পরিচয়ই পার্থক্যের কারণ’

জাতিসংঘে পাঠানো চিঠিতে মহুয়া মৈত্র মূলত কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁদের সহকর্মীদের আচরণের পার্থক্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর অভিযোগ, একই ধরনের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা অন্যান্য কর্মকর্তারা অমিত শাহের সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেও ওয়াকার রাজা, জাভেদ শামিম ও খলিল আহমেদকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।

মহুয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই তিন কর্মকর্তার মধ্যে একটি বিষয়ই অভিন্ন—তাঁরা মুসলিম। এই ধর্মীয় পরিচয়কেই তাঁদের বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি দেখছেন। তিনি এ ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত বর্জন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে সরকারি নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ঘটনাগুলোর প্রশাসনিক কারণ কী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল—সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।

মানবাধিকার সনদের প্রসঙ্গ

মহুয়া মৈত্র তাঁর চিঠিতে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের বিভিন্ন বিধানের কথাও উল্লেখ করেছেন।

তাঁর বক্তব্য, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তাকে আলাদা করে দেখা হলে তা সমতা ও বৈষম্যহীনতার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

তিনি বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ারের কাছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে এই কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার কারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

সরকারি নথি সংরক্ষণের আহ্বান

ঘটনাগুলোর তদন্ত বা ভবিষ্যৎ যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণের ওপরও জোর দিয়েছেন মহুয়া।

তিনি অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ সফরসংক্রান্ত সিসিটিভি ফুটেজ, কর্মকর্তাদের ট্যুর ডায়েরি এবং অন্যান্য সরকারি নথি সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, এসব নথি সংরক্ষিত থাকলে পরবর্তী সময়ে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি এবং তাঁদের সরকারি দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে সরকারি অনুষ্ঠান বা প্রশাসনিক কার্যক্রমে কোনো কর্মকর্তাকে শুধু তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বাদ না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থার নিরপেক্ষতার প্রশ্ন

মহুয়া মৈত্রের চিঠিতে বিষয়টি শুধু তিন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে নয়, বৃহত্তর প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার প্রশ্ন হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে।

তাঁর বক্তব্য, পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর আস্থা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দায়িত্ব পালনে কোনো বৈষম্য হলে তা সাধারণ মানুষের আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

এ কারণে তিনি পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে সংখ্যালঘুদের প্রতি নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন আচরণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

অভিযোগ ও মামলার দুই দিক

পুরো ঘটনাটি এখন দুইটি পৃথক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে, মহুয়া মৈত্র তাঁর অভিযোগ জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ারের কাছে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে অভিযোগ হয়েছে এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে।

অর্থাৎ, মহুয়ার অভিযোগের সত্যতা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। একইভাবে পুলিশের মামলাও তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের আইনগত দিক নিয়ে করা অভিযোগের ভিত্তিতে চলছে; এটি নিজেই তাঁর উত্থাপিত বৈষম্যের অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা প্রমাণ করে না।

জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করবেন, অথবা ভারত সরকারের কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যা চাওয়া হবে কি না—সেটিও এখনো জানা যায়নি।

ফলে অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ সফরকে ঘিরে তিন মুসলিম কর্মকর্তাকে সরকারি কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ, সেই অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার পর মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি জাতিসংঘের মানবাধিকার ব্যবস্থায় পৌঁছানো—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন ভারতের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স