ঢাকা

মুক্তিযুদ্ধ-ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ, ডাকসুর সংগ্রহশালা নিয়ে প্রতিবাদ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানিয়েছে গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্ট। সংগঠনটির নেতাদের অভিযোগ, এসব ছবি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উপস্থাপনে বিকৃতি ঘটানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কার্যালয়ে গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সমন্বয়ক ও সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন।

ডাকসুর সংগ্রহশালা সংস্কারের পর সেখানে জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত হয়েছে এবং আগের কিছু ছবির বিন্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। এ নিয়ে ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও জিন্নাহ ও আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনকে ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেছে এবং বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

‘ইতিহাস বিকৃতির’ অভিযোগ

গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের নেতারা সভায় বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও ঐতিহ্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁদের দাবি, গত দুই বছরে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারক, স্থাপনা ও ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

তাঁরা আরও বলেন, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা পরিবর্তনের দাবি, বেগম রোকেয়ার স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙার চেষ্টা এবং তাঁর গ্রাফিতিতে কালি লেপনের মতো ঘটনাগুলোও একই ধরনের প্রবণতার অংশ।

গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের নেতাদের ভাষ্য, এই প্রেক্ষাপটে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের ঘটনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের মতে, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে তাঁরা যেসব ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন, সেই ব্যক্তিদের ছবি সংগ্রহশালায় প্রদর্শন করা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উপস্থাপন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তবে ডাকসুর সংগ্রহশালার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য, জিন্নাহর ছবি তাঁকে গৌরবান্বিত করার উদ্দেশ্যে রাখা হয়নি। তাঁদের দাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরার অংশ হিসেবেই ছবিগুলো রাখা হয়েছে।

জিন্নাহর ছবি ঘিরে বিতর্ক

সংগ্রহশালা সংস্কারের পর জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত হওয়া নিয়ে কয়েক দিন ধরেই বিতর্ক চলছে। একটি ছবির সঙ্গে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাঁর দেওয়া বক্তব্যের তথ্যও রাখা হয়েছে বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমার বক্তব্য অনুযায়ী, জিন্নাহকে ব্যক্তিচিত্র হিসেবে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে ছবিগুলো রাখা হয়নি। সে সময় তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনাকে উপস্থাপনের জন্য ছবিগুলো সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে।

তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া এসেছে বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনের কাছ থেকে। ১৪ সেপ্টেম্বর এক শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় থাকা জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টও জিন্নাহ ও আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন, সংগ্রহশালার নতুন বিন্যাসে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার সংগ্রামে ছাত্রসমাজের ভূমিকার ইতিহাস যথাযথভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে না।

আব্দুল মালেকের ছবি নিয়েও প্রশ্ন

ডাকসুর সংগ্রহশালায় ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি যুক্ত হওয়াও বিতর্কের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

প্রথম আলোর পৃথক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আব্দুল মালেক ছিলেন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা এবং পরবর্তী সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবির তাঁর স্মৃতিকে সংগঠনের রাজনৈতিক ও আদর্শিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরে। তাঁর ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় যুক্ত হওয়ার পর এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের নেতারা সভায় দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী আলবদর বাহিনী গঠনের সঙ্গে ইসলামী ছাত্রসংঘের সংশ্লিষ্টতার প্রেক্ষাপটে আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উপস্থাপনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁদের মতে, এতে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও নির্যাতনের শিকার মানুষের প্রতি অবমাননার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তবে এ ধরনের বক্তব্যকে গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সংগ্রহশালা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আব্দুল মালেকের ছবি রাখার নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

‘রাজনৈতিক বার্তা’ দেখছে যুক্ত ফ্রন্ট

গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের নেতারা জিন্নাহ ও আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের ঘটনাকে কেবল একটি সংগ্রহশালার বিন্যাসের বিষয় হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের মতে, এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তির প্রতি একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে।

তাঁরা বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির তৎপরতা প্রতিহত করতে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তাঁরা গত দুই বছরে ধ্বংস হওয়া মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্মারকগুলো সরকারি উদ্যোগে পুনর্নির্মাণের দাবি জানান।

ভাস্কর্য ও স্মারক ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনারও দাবি জানানো হয় সভা থেকে।

হাম ও ডেঙ্গু নিয়েও আলোচনা

কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সভায় শুধু ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিষয় নয়, জনস্বাস্থ্যের পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। হাম ও ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের নেতারা।

ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিনা মূল্যে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়। এসব এলাকায় পরীক্ষার সরঞ্জাম নিয়ে গিয়ে তাৎক্ষণিক পরীক্ষা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তাঁরা।

তিন কর্মসূচি ঘোষণা

সভা থেকে তিনটি কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রথম কর্মসূচি ২৪ সেপ্টেম্বর। হাম ও ডেঙ্গুতে মৃত্যু এবং রোগ দুটির প্রকোপ কমাতে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে ওই দিন বিক্ষোভ সমাবেশ করা হবে। পরে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।

দ্বিতীয় কর্মসূচি ২৯ সেপ্টেম্বর। ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রতিবাদে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় কর্মসূচি ১৪ অক্টোবর। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নীতিমালায় থাকা সংগঠনটির ভাষায় ‘গণবিরোধী’ ধারাগুলো বাতিলের দাবিতে নির্বাচন কমিশনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হবে। এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কথা রয়েছে।

সভায় বিভিন্ন দলের নেতারা

গণতান্ত্রিক যুক্ত ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের এই সভায় সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশুসহ যুক্ত ফ্রন্টের বিভিন্ন শরিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় ডাকসুর সংগ্রহশালায় সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণ, হাম-ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবং ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংগঠনটির অবস্থান তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স