ঢাকা

হাসিনার প্রত্যর্পণে সরকারের উদ্যোগ-অগ্রগতি, প্রতিবেদন চেয়েছে সংসদীয় কমিটি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার কী ধরনের কূটনৈতিক ও আইনগত উদ্যোগ নিয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিটিকে জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনগত উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সংসদের ওয়েবসাইটেও ১৭ সেপ্টেম্বর কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার তথ্য রয়েছে।

বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ছাড়াও রোহিঙ্গা সংকট, অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির সদস্যরা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ ও এ ক্ষেত্রে অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চান।

ভারতকে বারবার তাগাদা দেওয়ার কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়

বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, কমিটির অন্তত দুজন সদস্য ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে অগ্রগতির জানতে চান। জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারতের সঙ্গে থাকা বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তির আলোকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে দেশটিকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, এ বিষয়ে সরকারের কোনো গাফিলতি নেই এবং সরকার শেখ হাসিনাকে কোনো শর্ত ছাড়া দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়। তবে এ পর্যন্ত কী কী কূটনৈতিক যোগাযোগ হয়েছে, ভারতের পক্ষ থেকে কী প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় বর্তমান অবস্থান কী—এসব বিষয়ে বৈঠকে বিস্তারিত লিখিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।

এ কারণেই সংসদীয় কমিটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি হালনাগাদ প্রতিবেদন চেয়েছে। কমিটির পরবর্তী বৈঠকে ওই প্রতিবেদন উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

মৌখিকভাবে উদ্যোগের কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়

স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরকারের নেওয়া উদ্যোগ সম্পর্কে মৌখিকভাবে জানিয়েছে। তবে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে জানার জন্য মন্ত্রণালয়কে বিস্তারিত ও হালনাগাদ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এর ফলে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার আনুষ্ঠানিক বিবরণ সংসদীয় কমিটির কাছে লিখিতভাবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত যোগাযোগের অগ্রগতি এবং আইনগত প্রক্রিয়ার অবস্থানও প্রতিবেদনে উঠে আসতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা

বৈঠকে শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নয়, দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও সংকটের সামগ্রিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করে সংসদীয় কমিটি।

বৈঠকে কমিটির পক্ষ থেকে আগামী অক্টোবরে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের আশা প্রকাশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্যাম্পগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি, রোহিঙ্গাদের জীবনযাপন এবং প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত বাস্তবতা সরেজমিনে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হবে।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর গুরুত্ব

বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামগ্রিক দিক নিয়েও আলোচনা হয়। সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারসাম্যপূর্ণ রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে বলা হয়, বিশ্বের প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব থাকবে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথাও উল্লেখ করা হয়।

এর অর্থ হলো, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থকে পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় দুর্বলতার কথা

বৈঠকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়। সেখানে বলা হয়, অতীতে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে গুরুতর পদ্ধতিগত দুর্বলতা ছিল। যথাযথ যাচাই-বাছাই না করার কারণে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা এখন মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রবাসী কর্মীদের তথ্য ও নথিপত্র যথাযথভাবে সত্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

এ ছাড়া প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।

কমিটি যাচাই করা রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রবাসী কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এর লক্ষ্য হিসেবে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অনিয়ম ও প্রতারণার ঝুঁকি কমানো এবং বিদেশগামী কর্মীদের তথ্য-নথির নির্ভুলতা নিশ্চিত করার বিষয়টি উঠে এসেছে।

মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসন নিয়েও আলোচনা

বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচারের বিষয়ও ছিল। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, ভুল তথ্য এবং যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি যেন মানব পাচার বা অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি তৈরি না করে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় আসে।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কর্মীদের তথ্য ও কাগজপত্রের যথাযথ যাচাই নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

বৈঠকে যারা ছিলেন

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, আমানউল্লাহ আমান, এস কে আজিজুল বারী, এ বি এম মোশাররফ হোসেন ও সানজিদা ইসলাম।

কমিটির বিশেষ আমন্ত্রণে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও বৈঠকে অংশ নেন।

বৃহস্পতিবারের বৈঠকটি ছিল ১৩তম জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক। সংসদের সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকটি ১৭ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়।

শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান ও কূটনৈতিক তৎপরতার বিস্তারিত তথ্য এখন সংসদীয় কমিটির চাওয়া প্রতিবেদনের মাধ্যমে সামনে আসার কথা। ফলে পরবর্তী বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী তথ্য দেয় এবং ভারতের সঙ্গে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত যোগাযোগের অগ্রগতি কীভাবে তুলে ধরে, সেটিই এখন এ বিষয়ে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স