সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্র হয়েছে। বৃহস্পতিবারের এসব হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজনই শিশু বলে হুতিদের সমর্থক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইফে হুতিদের একটি ড্রোন প্রতিহত করার সময় সেটির ধ্বংসাবশেষে একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ।
সেপ্টেম্বরজুড়ে হুতিদের হামলা জোরদারের পর সৌদি আরবে এই প্রথম কোনো প্রাণহানির ঘটনা প্রকাশ্যে এলো। একই সময়ে ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং বিমান হামলাও বেড়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা ইয়েমেন সংঘাত নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
তাইফে ড্রোন প্রতিহত, নিহত ১
সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইফ এলাকায় হুতিদের একটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়। ড্রোনটি ধ্বংস হওয়ার পর এর ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন ইয়েমেনি নাগরিক নিহত হন। আহত হন আরও দুজন। কয়েকটি ভবন ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছিল, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফে ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। এর পাল্টায় সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইয়েমেনে হামলা চালানোর ঘোষণা দেয়।
ইয়েমেনে নিহত তিন শিশু
অন্যদিকে হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশে তিনটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালিয়েছে। এতে একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে তারা। ইয়েমেনের আবস শহরেও হামলায় একজন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে হুতিদের গণমাধ্যম।
পরে হুতিদের সমর্থক গণমাধ্যমগুলো দাবি করে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর হামলায় তিন শিশু নিহত এবং বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। এসব প্রতিবেদনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে ‘ভাড়াটে যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হতাহতের এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে থাকা প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি অবশ্য দাবি করেছেন, তাইজ, মারিব, লাহজ, আল-জাওফ, হাজ্জাহ, আল-বায়দা ও আল-দালেতে হুতিদের বাহিনী বড় ধরনের আঘাতের মুখে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সাবার প্রতিবেদনে তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশ করা হয়।
মক্কার দিকে ড্রোন পাঠানোর দাবি প্রত্যাখ্যান হুতিদের
সাম্প্রতিক উত্তেজনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ঘটনাগুলোর একটি হলো মক্কার দিকে ড্রোন পাঠানোর সৌদি দাবি। সৌদি আরব জানিয়েছে, হুতিদের উৎক্ষেপণ করা একটি ড্রোন মক্কার দিকে যাচ্ছিল। সেটি মক্কার আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত ও ধ্বংস করে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি ঘটনাটিকে বেসামরিক নাগরিক ও মুসল্লিদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন হুতি নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি। বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি সৌদি দাবিকে ‘জঘন্য মিথ্যাচার’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর ভাষ্য, হুতিরা ইসলামের পবিত্রতম শহর মক্কাকে কখনো লক্ষ্যবস্তু করতে পারে না।
আল-হুতি বলেন, মক্কার পবিত্রতা ইয়েমেনের মানুষের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অভিযোগ, হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণে সৌদি আরব ‘মিথ্যাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে’। তিনি সৌদি দাবিকে ‘বড় ধরনের প্রচারণা’ বলেও উল্লেখ করেন।
ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-হুতির বক্তব্যের লক্ষ্য শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শ্রোতা নয়; আন্তর্জাতিক পরিসরেও সৌদি অভিযোগের জবাব দেওয়া। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল—হুতিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি।
ইরানের অবস্থান
মক্কার বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ নিয়ে ইরানও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর বিরুদ্ধে, বিশেষ করে মক্কার বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসন নিন্দনীয়।
তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘মক্কার পথে থাকা’ একটি ড্রোন প্রতিহত করার দাবি একাই হুতিদের ওই হামলার জন্য দায়ী করার যথেষ্ট প্রমাণ নয়। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ অঞ্চলে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অভিযানের বহু ঘটনা ঘটেছে—যদিও এ বক্তব্যের পক্ষে তিনি নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার বিস্তারিত দেননি।
চীনের কাছে সৌদির সহায়তা চাওয়ার দাবি
এদিকে সাম্প্রতিক হুতি হামলার পর সৌদি আরব বেইজিংয়ের কাছে সহায়তা চেয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ইরানের অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাতে সংস্থাটি বলেছে, সৌদি অনুরোধের পর চীন গোপনে ইরানি কর্মকর্তাদের হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রকাশ্যে অবশ্য বেইজিং সংযম, সংলাপ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বার্তা প্রকাশ্য অবস্থানের তুলনায় আরও কঠোর ছিল।
চীনের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের কারণে। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে এশিয়া-ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বাব আল-মান্দাব এলাকায় জাহাজ চলাচলও কমেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
পাকিস্তান-তুরস্কও জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক। গত মাসে সৌদি আরব এই দুই দেশের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে।
সাম্প্রতিক হুতি হামলার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে করা ‘মক্কা চুক্তি’ বাস্তবায়নের সময় এসেছে। তাঁর এ বক্তব্যের সময়ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে তিনি ফোনে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন।
এই যোগাযোগের ফলে সৌদি-হুতি সংঘাতের সঙ্গে আরও আঞ্চলিক পক্ষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে পাকিস্তান বা তুরস্ক সামরিকভাবে সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
নতুন করে তীব্র হচ্ছে ইয়েমেনের যুদ্ধ
সৌদি আরব ও হুতিদের সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা এমন এক সময়ে বাড়ছে, যখন ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে হুতিরা দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই তাইজ ও হোদেইদাসহ পশ্চিমাঞ্চলে লড়াই বেড়েছে। হুতিদের অগ্রযাত্রা লোহিত সাগরের উপকূল এবং কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি পৌঁছেছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের অগ্রযাত্রার কারণে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ইয়েমেনে ৮২ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েক হাজার মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতিতেও আশ্রয় নিয়েছেন।
ফলে সাম্প্রতিক সংঘাত শুধু সৌদি আরব ও হুতিদের পারস্পরিক হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা, বেসামরিক মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার কারণে ইয়েমেনের নতুন করে তীব্র হওয়া সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।