সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের দাপ্তরিক কাজের চাপ কমাতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে অফিস সহকারী নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদিত হলে এ প্রস্তাব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষে এ তথ্য জানান শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। শিক্ষামন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষকদের দাপ্তরিক কাজের চাপ কমানোর উদ্যোগ
শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যে বলা হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পৃথক অফিস সহকারী না থাকায় শিক্ষকদেরই বিভিন্ন দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ করতে হয়। এতে একদিকে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সময়ের সংকট দেখা দিতে পারে।
এ কারণে প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে অফিস সহকারী নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি বা পিইডিপি-৫ অনুমোদিত হলে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। অফিস সহকারী নিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজগুলো আলাদা জনবলের মাধ্যমে পরিচালনা করা সম্ভব হবে এবং শিক্ষকরা পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত উন্নয়নে আরও বেশি সময় দিতে পারবেন বলে মনে করছে সরকার।
প্রাথমিক শিক্ষায় ধর্মীয় শিক্ষা, চারুকলা ও সংগীত
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যভিত্তিক জ্ঞান নয়, মানসিক, নৈতিক ও সৃজনশীল বিকাশ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া তথ্যে জানানো হয়, দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত ধর্মীয় শিক্ষা, চারুকলা ও সংগীতচর্চা বাধ্যতামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য হলো, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত করা। এ ধরনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের পাশাপাশি তাদের মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধ ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সরকার।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যপুস্তকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগমের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের পাঠ্যপুস্তকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
শিক্ষার্থীদের বয়স ও শ্রেণি উপযোগী করে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের কারণ, ঘটনাপ্রবাহ, গণহত্যা, শহীদদের আত্মত্যাগ, নারীদের ভূমিকা এবং এ আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য পাঠ্যপুস্তকে তুলে ধরা হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঠ্যপুস্তকে এসব বিষয় এমনভাবে উপস্থাপন করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বয়স ও শ্রেণি অনুযায়ী ধারণা লাভ করতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট পাঠ্যপুস্তকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বিভিন্ন দিক পড়ার সুযোগ পাবে।
ইতিহাসের বইয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিভিন্ন ঘটনা
এ ছাড়া নবম ও দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ পাঠ্যপুস্তকে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের বিভিন্ন ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া তথ্যে বলা হয়, ওই পাঠ্যপুস্তকে গুম, গণহত্যা, অর্থ পাচার, নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস, পিলখানা ট্র্যাজেডি, সাংবাদিক হত্যা এবং গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে এসব বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাবে বলে সংসদে জানানো হয়েছে।
সব মাদ্রাসায় চালু হবে মিড–ডে মিল
দেশের মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের জন্যও স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শওকতুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসইডিপি কর্মসূচির আওতায় দেশের সব মাদ্রাসায় মিড–ডে মিল চালু করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে ২০৩০–৩১ অর্থবছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এর আওতায় ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোও থাকবে।
সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবারের সুবিধা পাবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ধরে রাখা এবং ঝরে পড়া কমানোর ক্ষেত্রেও মিড–ডে মিল কর্মসূচি ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
দেশে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা ৮ হাজার ২২৯
নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মুনতাকিমের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী দেশে বর্তমানে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার সংখ্যা তুলে ধরেন।
সংসদে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার সংখ্যা ৮ হাজার ২২৯টি।
এর মধ্যে দাখিল মাদ্রাসা ৫ হাজার ৭৬৮টি, আলিম মাদ্রাসা ১ হাজার ২৮৪টি, ফাজিল মাদ্রাসা ৯৯৩টি এবং কামিল মাদ্রাসা ১৮৪টি।
মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য পুষ্টি ও সহায়তামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণের পরিকল্পনা নেই
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খানের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৮৭৩টি।
তবে এসব বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণের কোনো পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই।
অর্থাৎ নিবন্ধিত এসব বিদ্যালয় বর্তমানে যে কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, আপাতত সেখানেই থাকবে। সরকার এগুলোকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রূপান্তরের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে সংসদে জানানো হয়েছে।
প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ
গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার সম্পর্কেও তথ্য দেওয়া হয়।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং ঝরে পড়ার হার কমাতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে স্কুল ফিডিং, উপবৃত্তি প্রদানসহ বিভিন্ন সহায়তামূলক কার্যক্রম রয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে এসব কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং আর্থিক বা সামাজিক কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা কমানো।
অনলাইনে নিবন্ধনের আওতায় আসছে কিন্ডারগার্টেন
এদিকে দেশের সব কিন্ডারগার্টেন স্কুলকে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিবন্ধনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে।
নীলফামারী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফীর প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৭৮৩টি কিন্ডারগার্টেন নিবন্ধনের আওতায় এসেছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অনলাইনভিত্তিক আবেদন ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোকে পর্যায়ক্রমে নিবন্ধনের আওতায় আনা হচ্ছে।
এর ফলে বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত এসব প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সরকারের কাছে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষায় একাধিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া বিভিন্ন তথ্য থেকে প্রাথমিক ও মাদ্রাসাশিক্ষায় সরকারের একাধিক পরিকল্পনার বিষয়টি উঠে এসেছে। একদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাপ্তরিক চাপ কমাতে অফিস সহকারী নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মানসিক, নৈতিক ও সৃজনশীল বিকাশে ধর্মীয় শিক্ষা, চারুকলা ও সংগীতচর্চা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি ঝরে পড়া কমাতে স্কুল ফিডিং ও উপবৃত্তি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। মাদ্রাসাগুলোতে মিড–ডে মিল চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
অন্যদিকে পাঠ্যক্রমে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বিভিন্ন বিষয় এবং নবম-দশম শ্রেণির ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের বিভিন্ন ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও সংসদে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় একাধিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এসব পরিকল্পনার মধ্যে পিইডিপি-৫ অনুমোদনের পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী নিয়োগের উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষকদের দাপ্তরিক দায়িত্ব কমিয়ে তাঁদের মূল দায়িত্ব—পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত বিকাশে—আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।