ঢাকা

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দেবে এনসিপি, ঢাকার দুই সিটিতে আসিফ-পাটওয়ারী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে প্রার্থী দেবে না জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচনেও দলটি এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চূড়ান্ত করেছে দলটি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) এনসিপির প্রার্থী হচ্ছেন দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) প্রার্থী হচ্ছেন দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তবে তাঁদের প্রার্থিতা আনুষ্ঠানিকভাবে পরে ঘোষণা করবে দল।

এনসিপির দলীয় সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ না নিয়ে আলাদাভাবে নির্বাচন করার বিষয়ে ১১–দলীয় ঐক্যের শরিকদের মধ্যে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে। সম্প্রতি ১১–দলীয় ঐক্যের ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চ কর্মসূচির প্রস্তুতি সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপর এনসিপির রাজনৈতিক পরিষদের বৈঠকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ঢাকা উত্তরে আসিফ, দক্ষিণে পাটওয়ারী

এনসিপির দলীয় সূত্র জানায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে দলটি একাধিক সমীক্ষা চালায়। এসব সমীক্ষায় ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করা হলে তুলনামূলক ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে উঠে আসে।

এরপর আসিফ মাহমুদ নিজেও ঢাকা উত্তরের মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাচাই করেন। পরে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করার বিষয়ে সম্মতি দেন।

এর আগে গত ৩০ মার্চ ঢাকাসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছিল এনসিপি। তখন ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা উত্তরে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবকে প্রার্থী করা হয়েছিল।

এখন সেই সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আরিফুল ইসলাম আদীবকে বাদ দিয়ে ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদের পরিবর্তে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করা হচ্ছে।

দলীয় সূত্র বলছে, প্রার্থী পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ঢাকার দুই সিটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সম্ভাব্য ভোটার সমর্থন এবং প্রার্থীদের নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

ভোটার এলাকা পরিবর্তন দুজনের

মেয়র পদে নির্বাচনকে সামনে রেখে আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দুজনই তাঁদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। আসিফ মাহমুদ ঢাকা দক্ষিণের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আফতাবনগর এলাকার ভোটার হয়েছেন।

অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা উত্তর থেকে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে ঢাকা দক্ষিণের আওতাধীন ঢাকা-৮ সংসদীয় এলাকার ভোটার হয়েছেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একইভাবে মনোনয়নপত্রের প্রস্তাবক ও সমর্থককেও সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হতে হয়। ফলে মেয়র পদে নির্বাচন করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই দুজন ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন বলে জানিয়েছেন এনসিপির নেতারা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় এলাকার ভোটার হওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হওয়ায় প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতিতে ভোটার এলাকা পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নাসীরুদ্দীনের আগের রাজনৈতিক অবস্থান

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। অল্প ব্যবধানে তাঁকে পরাজিত করে জয়ী হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।

এনসিপির দলীয় সূত্র বলছে, ওই নির্বাচনে ঢাকা-৮ এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ফলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর একটি রাজনৈতিক অবস্থান ও পরিচিতি তৈরি হয়েছে। দলীয় সমীক্ষাতেও সেটির প্রতিফলন পাওয়া গেছে। এসব বিবেচনায় তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি। তবে এনসিপির মুখপাত্র হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি ও মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে তাঁকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের ভাষ্য।

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পরে

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ মেয়র পদে নির্বাচন করবেন এবং দক্ষিণে তাঁর নিজের নির্বাচন করার কথা রয়েছে। তবে দল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করার পরই বিষয়টি নিশ্চিত হবে।

আসিফ মাহমুদও জানিয়েছেন, তাঁর এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ভোটার এলাকা পরিবর্তন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির অংশ। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে দলের সর্বোচ্চ ফোরামে আলোচনা করে তাঁকে ঢাকা উত্তরে এবং নাসীরুদ্দীনকে ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে নির্বাচন করানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে প্রার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে পরে ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

পাঁচ সিটিতে আগের প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন

গত ৩০ মার্চ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের পাশাপাশি আরও তিনটি সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছিল এনসিপি।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক আবদুর রহমান আফজালকে মেয়র পদে প্রার্থী করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

ঢাকার দুই সিটির প্রার্থী পরিবর্তন হলেও কুমিল্লা, রাজশাহী ও সিলেটের প্রার্থীদের বিষয়ে এখন পর্যন্ত পরিবর্তনের কথা জানা যায়নি।

স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, সিটি করপোরেশনসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই এককভাবে অংশ নেবে এনসিপি। সেই লক্ষ্যেই দলীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

দলটির নেতারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাস্তবতা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী বাছাই, সাংগঠনিক অবস্থান, ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক এবং এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণকে বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। এ কারণে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় জোটের পরিবর্তে নিজস্ব প্রার্থী নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাকে বেশি কার্যকর মনে করছে এনসিপি।

জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা

এদিকে জামায়াতে ইসলামী এখনো সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। তবে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঢাকার দুই সিটিতে কয়েকজনের নাম নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম এবং ঢাকা উত্তরে মহানগর আমির সেলিম উদ্দিন মেয়র পদে নির্বাচন করতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।

ফলে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী একই রাজনৈতিক ঐক্যের অংশ হলেও ঢাকার দুই সিটিতে পৃথক প্রার্থী নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে পারে—এমন সম্ভাবনাই এখন সামনে এসেছে।

রাজনীতিতে জোট, স্থানীয় ভোটে আলাদা

জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের আগ্রহ কম। এনসিপিসহ অন্য শরিকদের মধ্যেও স্থানীয় নির্বাচনে কার্যকরভাবে জোটগত প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ নেই।

তাঁদের যুক্তি, অতীতেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক জোটের ভিত্তিতে সমন্বিতভাবে প্রার্থী দেওয়ার খুব বেশি নজির নেই। স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিটি এলাকার নিজস্ব রাজনৈতিক সমীকরণ থাকায় জোটের প্রার্থী নির্ধারণও জটিল হয়ে পড়ে।

এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ১১–দলীয় ঐক্যের নেতারা স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে প্রার্থী দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তবে স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও রাজনৈতিকভাবে ১১–দলীয় ঐক্য অটুট থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।

তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস–সংকটসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ১১ দল যৌথভাবে কর্মসূচি পালন করবে। এর মধ্যে আরও তিনটি লংমার্চ এবং পরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কর্মসূচি রয়েছে।

পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘাত এড়াতে সমন্বয়

এনসিপি ও জামায়াতের সূত্রগুলো বলছে, স্থানীয় নির্বাচনে আলাদাভাবে প্রার্থী দিলেও ১১–দলীয় ঐক্যের শরিকদের মধ্যে সমন্বয় থাকবে। বিশেষ করে একই এলাকায় শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা যাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে না জড়ান, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে।

নির্বাচন কমিশন বা সরকারের পক্ষ থেকে অসহযোগিতা কিংবা কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হলে ১১–দলীয় ঐক্যের শরিকেরা সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করবে বলেও দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

কেন্দ্রীয় পর্যায়েও এ ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে শরিক দলগুলো একসঙ্গে অংশ নেবে।

১১–দলীয় ঐক্য থাকবে, কৌশল হবে আলাদা

জামায়াতে ইসলামী ছাড়া ১১–দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক হলো জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, রাজনৈতিকভাবে ১১ দল ঐক্যবদ্ধভাবে এগোবে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে তাঁরা আলাদাভাবে ভোট করবেন।

তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে তাঁদের প্রচারের লক্ষ্য কোনো ব্যক্তি নয়; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থা। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাঁরা সোচ্চার থাকবেন।

ফলে জাতীয় রাজনীতিতে ১১–দলীয় ঐক্য বজায় রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজ নিজ প্রতীকে ও প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামার কৌশল নিয়েছে এনসিপি ও তাদের শরিকেরা। ঢাকার দুই সিটিতে আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে সামনে রেখে এনসিপির প্রস্তুতিও সেই পৃথক নির্বাচনী কৌশলেরই অংশ।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স