ঢাকা

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নিয়ে কঠোর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রয়টার্স

গাজা যুদ্ধ ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে শিল্পোন্নত তিন দেশ। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা।

মঙ্গলবার যৌথভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায় তিন দেশ। তাদের এই পদক্ষেপকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ঠেকাতে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের প্রতি পশ্চিমা মিত্রদের নীতিতে ক্রমবর্ধমান কঠোর অবস্থানেরও ইঙ্গিত মিলছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড পার্লামেন্টে বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিষয়ে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করে বসে থাকার সময় শেষ হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘চুপচাপ দাঁড়িয়ে মানুষের আরও দুর্দশা এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধান ধ্বংস হতে দেখাটা আমরা আজ থেকে বাদ দিলাম।’

মিলিব্যান্ডের এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে লন্ডনের অবস্থানের পরিবর্তনও স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ও একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে পাশাপাশি রেখে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান করে আসছে। তবে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে এই সমাধানের পথে বড় বাধা হিসেবে বিবেচনা করে দেশটি।

পশ্চিম তীরের দখলকে ‘সম্পূর্ণ অবৈধ’ বলল লন্ডন

গত জুলাইয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া এড মিলিব্যান্ড বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারত্ব সম্পূর্ণ অবৈধ। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নিধন চালানো হচ্ছে বলেও লন্ডন মনে করে বলে জানান তিনি।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ রয়েছে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এসব বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অবৈধ বলে বিবেচনা করে। ইসরায়েল অবশ্য এ ধরনের অবস্থানের সঙ্গে একমত নয় এবং পশ্চিম তীরের ওপর নিজেদের ঐতিহাসিক ও নিরাপত্তাগত দাবির কথা বলে আসছে।

নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় মূলত অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য পড়বে। এসব পণ্যের মধ্যে কৃষিপণ্য ও ওয়াইন উল্লেখযোগ্য। তবে ইসরায়েল থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়া মোট পণ্যের তুলনায় এসব পণ্যের পরিমাণ খুবই কম।

বাণিজ্যে প্রভাব সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা

যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি পাউন্ডের বাণিজ্য হয়। ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞা দুই দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যে বড় ধরনের আর্থিক প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

এর একটি বড় কারণ হলো, পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য এবং ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ কীভাবে করা হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে যাওয়া পণ্যের বেশির ভাগই কৃষিপণ্য ও ওয়াইন। ইসরায়েলের সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্যের তুলনায় এসব পণ্যের অংশও খুব বেশি নয়। ফলে নিষেধাজ্ঞাটির তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত হতে পারে।

তবে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ পশ্চিমা মিত্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা একই সঙ্গে পশ্চিম তীরের বসতি নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সমালোচনা

তবে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার ঘোষণার সমালোচনা এসেছে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে। তিনি এই নিষেধাজ্ঞার কঠোর বিরোধিতা করেছেন।

ইসরায়েলের ভেতর থেকেও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। দেশটির দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ তেল আবিবে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

পূর্ব জেরুজালেমের ওই কনস্যুলেট ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্কিত বিভিন্ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ফলে এটি বন্ধ করার দাবি বাস্তবায়িত হলে তা যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও বড় কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

‘ই–ওয়ান’ প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে জেরুজালেমের কাছাকাছি ‘ই–ওয়ান’ নামে পরিচিত বসতি প্রকল্প।

প্রকল্পটি এমন একটি এলাকায় গড়ে উঠছে, যেটিকে ভবিষ্যৎ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিলিব্যান্ডের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে একটি কার্যকর ও ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তার ভাষায়, ই–ওয়ান প্রকল্প দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে।

পশ্চিম তীরকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সেখানে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের ফলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড খণ্ডিত হয়ে পড়ছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে ফিলিস্তিনিরা ও তাদের সমর্থক দেশগুলো।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই নতুন বসতির ঘোষণা

ব্রিটিশ, ফরাসি ও কানাডীয় নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার দিনই পশ্চিম তীরে আরও বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ।

তিনি পশ্চিম তীরে আরও এক হাজার নতুন বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখার বিষয়ে দেশটির সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।

ইসরায়েলি সরকারের কট্টর ডানপন্থী অংশ দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়ে আসছে। তাদের কেউ কেউ পশ্চিম তীরের ওপর ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠারও দাবি করেন।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ মনে করে, বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক সম্ভাবনা ক্রমেই সংকুচিত হবে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বাড়ছে আন্তর্জাতিক চাপ

গাজা যুদ্ধের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের মধ্যে ইসরায়েলি সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনা বাড়ছে।

যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার নতুন নিষেধাজ্ঞা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। তিন দেশের এই যৌথ পদক্ষেপ ইসরায়েলের ওপর সরাসরি অর্থনৈতিক চাপের চেয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

একদিকে ইসরায়েল তার নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের যুক্তি তুলে ধরে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণকে এগিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলের বড় অংশ মনে করছে, এ ধরনের পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করছে।

এই বিরোধ আগামী দিনগুলোতে ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্রদের সম্পর্কেও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার মতো দেশ একই সময়ে বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ইসরায়েলের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের অবস্থান কতটা কঠোর হচ্ছে, তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

এদিকে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় ইসরায়েলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন। ফলে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনও আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ঠেকাতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার যৌথ নিষেধাজ্ঞা সরাসরি বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি না করলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য যথেষ্ট। বিশেষ করে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, এই পদক্ষেপ তারই প্রতিফলন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স