ঢাকা

শিশুদের বুনিয়াদি শিক্ষা শক্তিশালী করতে এআই ব্যবহারে গুরুত্ব শিক্ষামন্ত্রীর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বাংলাদেশের শিশুদের ভিত্তিমূলক শিক্ষা বা বুনিয়াদি শিখনে এখনও দুর্বলতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, শিশুদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারে সক্ষম করে তুলতে হলে প্রথমেই তাদের মৌলিক শিখনদক্ষতা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, এআই থেকে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে হলে শিশুদের পড়া, যুক্তি প্রয়োগ এবং তথ্য যাচাইয়ের মতো মৌলিক দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এআই প্রযুক্তি চালুর ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ফ্রান্সের প্যারিসে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘ডিজিটাল লার্নিং উইক-২০২৬’-এর ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষা’ শীর্ষক অধিবেশনে এসব কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। অধিবেশনে ২৫টি দেশের শিক্ষামন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা অংশ নেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

মৌলিক শিখনদক্ষতার ওপর জোর

এহছানুল হক মিলন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এআইয়ের সুবিধা নিতে হলে শিক্ষার্থীদের এমন কিছু মৌলিক দক্ষতা থাকতে হবে, যার মাধ্যমে তারা এআই থেকে পাওয়া তথ্য বুঝতে, বিশ্লেষণ করতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যাচাই করতে পারে।

বিশেষ করে শিশুদের পড়ার সক্ষমতা, যুক্তি প্রয়োগের দক্ষতা এবং তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, এসব মৌলিক দক্ষতা দুর্বল থাকলে এআইনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার সুফল শিক্ষার্থীদের কাছে পুরোপুরি পৌঁছানো কঠিন হবে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এআইয়ের ব্যবহার শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও তথ্য সম্পর্কে সচেতনতার বিষয়টিও জড়িত। তাই শিশুদের এআই ব্যবহারে সক্ষম করে তোলার পাশাপাশি তাদের মৌলিক শিখনদক্ষতা উন্নয়নের দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

এআই চালুর আগে শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনো প্রযুক্তি বা ব্যবস্থা চালুর আগে শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এহছানুল হক মিলন।

তিনি বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এআই প্রযুক্তি কেনা বা ব্যবহার শুরু করার আগে শিক্ষকদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। এআই চালুর পুরো প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের যুক্ত রাখতে হবে। এর মধ্যে পরীক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণ, প্রযুক্তি বা সরঞ্জাম ক্রয়, এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রীর মতে, শ্রেণিকক্ষে এআইয়ের বাস্তব ব্যবহার সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ধারণা শিক্ষকদেরই রয়েছে। ফলে প্রযুক্তি চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিলে এআই ব্যবহারের কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব।

তিনি বলেন, প্রযুক্তি শিক্ষকদের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং শিক্ষকদের কাজকে আরও কার্যকর ও সহজ করার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও প্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

সব ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সুযোগ নেই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজনীয়তা ও সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, এআই মানুষের অনেক সময় বাঁচাতে পারে এবং বিভিন্ন কাজকে দ্রুত ও সহজ করে দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের কাজেই এআই ব্যবহার করতে হবে।

এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের অনেক সময় বাঁচায়। তাই বলে সব ক্ষেত্রে এটা ব্যবহার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সময়ের চাহিদায় এর থেকে পিছিয়ে থাকারও সুযোগ নেই।’

অর্থাৎ, শিক্ষাক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে, অন্যদিকে এর প্রয়োজনীয়তা, উপযোগিতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

শিক্ষার্থীর ফলাফল দিয়ে এআইয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এআই কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, তা নির্ধারণের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশে এআইয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল, শিক্ষকদের কাজের চাপ, শিক্ষায় সমতা, নিরাপত্তা এবং ব্যয়-সাশ্রয়ের মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে।

শুধু প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে কি না, সেটিকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এআই ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীরা কতটা ভালো শিখছে, শিক্ষকদের কাজ কতটা সহজ হচ্ছে, সব ধরনের শিক্ষার্থী সমানভাবে সুবিধা পাচ্ছে কি না এবং এর সঙ্গে কোনো নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না—এসব বিষয় মূল্যায়ন করতে হবে।

একই সঙ্গে এআই ব্যবহারের ফলে শিক্ষা খাতে ব্যয় কতটা কমানো সম্ভব হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

এআই ব্যবহারে শিক্ষকদের ভূমিকা নির্ধারণের প্রয়োজন

শিক্ষাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের ভূমিকা কী হবে, সেটিও নির্ধারণ করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন এহছানুল হক মিলন।

তিনি বলেন, শিক্ষকেরা কীভাবে এবং কতটুকু এআইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারেন, তা বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ, এআইকে শিক্ষকদের কাজের পরিপূরক হিসেবে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

এআইয়ের মাধ্যমে পাঠ প্রস্তুত, তথ্য বিশ্লেষণ, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ বা অন্যান্য একাডেমিক কাজে সহায়তা নেওয়া সম্ভব হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার মৌলিক দক্ষতার সমন্বয়

প্যারিসের আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী মূলত প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সঙ্গে মৌলিক শিখনদক্ষতার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় এআইকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও শিক্ষার্থীদের মৌলিক চিন্তা ও শেখার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে এআই ব্যবহারের পাশাপাশি শিশুদের পড়া, যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

এ কারণে বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা করার সময় প্রযুক্তি কেনা বা ব্যবহারের বিষয়টির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল, শিক্ষক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা, সমতা ও ব্যয়ের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।

ইউনেসকোর ‘ডিজিটাল লার্নিং উইক-২০২৬’-এর এই অধিবেশনে ২৫টি দেশের মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষার ভবিষ্যৎ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিখনদক্ষতা জোরদার করার পাশাপাশি এআইকে দায়িত্বশীল ও কার্যকরভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরেন এহছানুল হক মিলন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স