ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত এবং তাঁকে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার আবেদনটির ওপর আগামীকাল মঙ্গলবার আদেশ দেবেন আপিল বিভাগ।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ সোমবার শুনানি শেষে আদেশের জন্য এ দিন নির্ধারণ করেন। একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন আবেদনটি করেছেন। আবেদনে হাইকোর্টের রায় স্থগিতের পাশাপাশি সরোয়ার আলমগীরকে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখারও আরজি জানানো হয়েছে।
নির্বাচনের পর আইনি জটিলতা
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন সরোয়ার আলমগীর। নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করে। এরপর প্রার্থিতা ফিরে পেতে তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
প্রাথমিক শুনানিতে হাইকোর্ট রুল জারি করে তাঁকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন এবং ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দের নির্দেশ দেন। সেই আদেশের ভিত্তিতেই তিনি নির্বাচনে অংশ নেন। তবে আপিল বিভাগের পূর্ববর্তী আদেশ অনুযায়ী তাঁর নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ স্থগিত ছিল।
পরে রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে রুল যথাযথ (অ্যাবসলিউট) ঘোষণা করেন। ওই রায়ের পরই নির্বাচন কমিশন সচিবালয় চট্টগ্রাম-২ আসনে সরোয়ার আলমগীরকে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে। একই দিন সন্ধ্যায় তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
এরপর হাইকোর্টের ওই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে গত ১২ জুলাই আপিল বিভাগে আবেদন করেন জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন।
শুনানিতে যা হলো
আবেদনটি প্রথমে চেম্বার আদালত হয়ে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য আসে। ধারাবাহিক শুনানির অংশ হিসেবে সোমবার বিষয়টি শুনানি হয়।
আদালতে জামায়াতের প্রার্থী নুরুল আমিনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তাঁকে সহায়তা করেন আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী।
অন্যদিকে সরোয়ার আলমগীরের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম এবং এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। রাষ্ট্রের পক্ষে শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
শুনানি শেষে আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী সাংবাদিকদের জানান, হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিতের পাশাপাশি সরোয়ার আলমগীরকে সংসদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার আবেদনও করা হয়েছে। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ আগামী মঙ্গলবার আদেশের জন্য দিন নির্ধারণ করেছেন।
দুই প্রার্থীর আইনি লড়াই যেভাবে শুরু
আদালতের নথি অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য চট্টগ্রাম-২ আসনে সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র গত ২ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তা বৈধ ঘোষণা করেন।
এর বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন। তিনি অভিযোগ করেন, সরোয়ার ঋণখেলাপি হওয়ায় তাঁর মনোনয়ন বৈধ হতে পারে না।
ওই আপিল গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশন গত ১৮ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বাতিল করে এবং সরোয়ারের প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করে।
এরপর সরোয়ার হাইকোর্টে রিট করলে গত ২৭ জানুয়ারি আদালত তাঁকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দের নির্দেশ দেন।
হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি (লিভ টু আপিল) চেয়ে আবেদন করেন জামায়াতের প্রার্থী। আপিল বিভাগ গত ৩ ফেব্রুয়ারি সেই আবেদন মঞ্জুর করে গুরুত্বপূর্ণ একটি আদেশ দেন। আদালত বলেন, সরোয়ার নির্বাচনে বিজয়ী হলেও তাঁর নির্বাচনী ফলাফল-সংক্রান্ত কার্যক্রম আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।
পরে গত ৩১ মার্চ নিয়মিত আপিল দায়ের করেন নুরুল আমিন। সেই আপিলের ওপর ১৬ জুন আপিল বিভাগ হাইকোর্টকে দ্রুত, সম্ভব হলে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ৩ ফেব্রুয়ারির আদেশ বহাল রাখেন, অর্থাৎ হাইকোর্টে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরোয়ারের ফলাফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে বলে উল্লেখ করেন।
পরবর্তীতে হাইকোর্ট ৯ জুলাই রুল যথাযথ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বাতিল করলে নির্বাচন কমিশন সরোয়ারকে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে এবং তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন।
তবে সেই রায়ের বিরুদ্ধেই বর্তমানে আপিল বিভাগে আইনি লড়াই চলছে। আগামী মঙ্গলবারের আদেশে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা, সরোয়ার আলমগীরের সংসদ সদস্য হিসেবে অবস্থান এবং সংসদ অধিবেশনে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়ে আপিল বিভাগের তাৎক্ষণিক অবস্থান স্পষ্ট হতে পারে।