ঢাকা

নিরাপত্তা বাহিনীর ছররা গুলি, কার নির্দেশে অভিযান—জোরালো প্রশ্ন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
শিক্ষার্থীদের সংসদ অভিযান ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ছররা গুলি (পেলেট) ব্যবহার করেছিলেন কি না—এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে চলা বিতর্কের মধ্যে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ভারতের আধাসামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (র‍্যাফ) এক সদস্য অন্তত সাতটি ছররা গুলি ছুড়েছিলেন। তবে এই গুলি কার নির্দেশে ছোড়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নের এখনো কোনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআরপিএফের প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, ছোড়া সাতটি পেলেটের মধ্যে দুটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় এবং বাকি পাঁচটি আন্দোলনকারীদের গায়ে লাগে। যদিও এ বিষয়ে সিআরপিএফ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেয়নি।

বিতর্কের অবসান নয়, নতুন প্রশ্নের জন্ম

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দমনে পেলেট ব্যবহারের অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছিল দিল্লি পুলিশ। তারা দাবি করেছিল, তাদের সদস্যরা কোনো পেলেটগান ব্যবহার করেননি। ফলে আহত শিক্ষার্থীদের শরীরে পাওয়া ছররা কোথা থেকে এল—তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়।

পরে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় র‍্যাফকে। সেই তদন্তের প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর এখন নতুন প্রশ্ন উঠেছে—যদি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাই ছররা গুলি চালিয়ে থাকেন, তাহলে সেই নির্দেশ কে দিয়েছিলেন?

রাহুল গান্ধীর প্রশ্ন

লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি দিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

তিনি জানতে চান, আন্দোলনকারীদের ওপর কেন পেলেট ব্যবহার করা হলো এবং এই সিদ্ধান্ত কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুমোদনে নেওয়া হয়েছিল।

রাহুল প্রশ্ন তোলেন, যদি অমিত শাহ নির্দেশ না দিয়ে থাকেন, তাহলে কার নির্দেশে নিরাপত্তা বাহিনী এই পদক্ষেপ নেয়?

চিঠিতে তিনি আরও জানতে চান, পুলিশের সঙ্গে সাধারণ পোশাকে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে লাঠি ও ব্যাটন ব্যবহার করেছেন, তাঁরা কারা। তাঁরা পুলিশ সদস্য ছিলেন, নাকি অন্য কোনো স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠীর সদস্য—সেটিও স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি।

গত রোববার রাহুল গান্ধী চিঠিটির অনুলিপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করেন।

আহত শিক্ষার্থীদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

পেলেটে আহত শিক্ষার্থীদের ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

রাহুল গান্ধী ইতোমধ্যে আহত এক শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, এমন আরও অনেক আহত শিক্ষার্থী রয়েছেন, যাঁদের ঘটনা এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি।

বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমেও আহত আন্দোলনকারীদের ছবি ও সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে।

বিরোধী দলগুলো শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমা চাইতে হবে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংসদে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।

মামলা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবে অগ্রগতি নেই

আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীরা যন্তর মন্তর ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেলেও তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা ও এফআইআর প্রত্যাহারের দাবি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

ছাত্রনেতাদের দাবি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং তাঁদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে এসব মামলা প্রত্যাহার করা হবে। এমনকি শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও সে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

তবে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি নির্দেশ তাদের কাছে পৌঁছেনি। ফলে মামলা প্রত্যাহারের কার্যক্রমও শুরু হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলন চলাকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাঁরা পোস্ট করেছিলেন, তাঁদের শনাক্ত করার কাজও শুরু করেছে দিল্লি পুলিশ।

এ লক্ষ্যে একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। কিছু ভিডিও ও পোস্টকে ‘আপত্তিকর’ উল্লেখ করে সেগুলো সরিয়ে ফেলার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিভিন্ন রাজ্যে হামলার অভিযোগ

দিল্লি থেকে নিজ নিজ রাজ্যে ফেরার পরও অনেক শিক্ষার্থী হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু বীর সেনা–র এক নেতা দুই শিক্ষার্থীকে চড় মারছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগেও আটটি এফআইআর ছিল। তবে বর্তমান ঘটনায় কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না করায় তাঁর বিরুদ্ধে নতুন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ

আরেক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের বিনা মূল্যে খাবার বিতরণ করায় পুলিশ পরিচয়ে কয়েকজন তাঁকে আটক করেন।

তাঁর দাবি, চোখ বেঁধে তাঁকে মুসৌরি নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

নির্দেশদাতার পরিচয় নিয়েই মূল বিতর্ক

সিআরপিএফের প্রাথমিক তদন্তে পেলেট ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসায় একটি বিতর্কের অবসান হলেও নতুন করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে এসেছে—নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কার নির্দেশে শিক্ষার্থীদের ওপর ছররা গুলি চালিয়েছিলেন?

বিরোধী দলগুলোর দাবি, এই প্রশ্নের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে সরকার এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বলপ্রয়োগ, নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা এবং সরকারের জবাবদিহি—এই তিনটি বিষয়ই ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স