ঢাকা

ঢাকা দক্ষিণ সিটি: সাদিক কায়েমকে প্রার্থী ঘোষণা, এখন নজর আসিফ মাহমুদের দিকে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী। তবে এর আগেই জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একই পদে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে প্রার্থী ঘোষণা করেছিল।

জামায়াতের এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়া দুই দলের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সমঝোতা হবে নাকি তারা আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে—সে প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা নতুন আলোচনায়

রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও ঢাকা-১০ আসনে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন আসিফ মাহমুদ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি প্রার্থী হননি।

এনসিপির একাধিক শীর্ষ নেতার দাবি, সে সময় আসিফ মাহমুদকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের আপত্তি ছিল। দলটির অভিযোগ ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা কিছু অভিযোগের কারণে তাঁকে সমর্থন দেওয়া সম্ভব নয়।

এনসিপির একটি সূত্রের ভাষ্য, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিষয়টিকে দুই দলের সম্পর্কের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়নি এবং প্রতিটি দলই আপাতত নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করতে প্রার্থী ঘোষণা করছে।

এখনো হয়নি জোট বা সমঝোতার সিদ্ধান্ত

গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি জোটবদ্ধভাবে অংশ নিয়েছিল। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচনী জোট বা আসন সমঝোতার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

এনসিপির সূত্র বলছে, দলটি আপাতত একক প্রস্তুতিতেই মনোযোগ দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশন এখনো তফসিল ঘোষণা না করায় আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। যদিও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

দলটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ঢাকা দক্ষিণে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সাদিক কায়েমের নাম সামনে আসার পর এনসিপির ভেতরে, বিশেষ করে আসিফ মাহমুদের সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

আসিফ মাহমুদের রাজনৈতিক অবস্থান

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের সামনের সারিতে ছিলেন আসিফ মাহমুদ। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের তিন ছাত্র উপদেষ্টার একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর সরকার থেকে পদত্যাগ করে তিনি এনসিপিতে যোগ দেন এবং দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব নেন। এরপর ঢাকা-১০ আসন থেকে সংসদ নির্বাচন করার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি।

এনসিপির এক রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্যের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামায়াতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে আসিফ মাহমুদের ভূমিকা দলটির কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। যদিও কী ধরনের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে এনসিপির পরিকল্পনা

এনসিপি ইতোমধ্যে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ এবং প্রায় ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। গত ২৯ মার্চ ঘোষিত তালিকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে আসিফ মাহমুদের নাম রয়েছে।

দলটির নেতারা বলছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে আসিফ মাহমুদের বৈঠকও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

খেলাফত মজলিস বর্তমানে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক। আবার সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যেও নতুন সমন্বয়ের আলোচনা চলছে। ফলে মামুনুল হকের সঙ্গে আসিফ মাহমুদের যোগাযোগকে অনেকেই সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবে দেখছেন।

সম্ভাব্য সমঝোতার নানা হিসাব

এনসিপির দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এখনো কোনো জোটগত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ভবিষ্যতে যদি নতুন কোনো সমঝোতা হয়, তাহলে ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ এবং ঢাকা উত্তরে মামুনুল হককে ঘিরে সমর্থনের নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, যদি এনসিপি জামায়াতের সঙ্গেই নির্বাচনী সমঝোতায় যায়, তাহলে ঢাকার দুই সিটির একটি কিংবা কুমিল্লা অথবা ঢাকার আশপাশের কোনো সিটিতে সমর্থনের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।

তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।

এনসিপি: তফসিলের পরই চূড়ান্ত হবে সমঝোতা

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে বা পরে যদি জাতীয়ভাবে মনে হয় যে সমঝোতার মাধ্যমে সরকারি দলের বাইরে বিরোধী প্রার্থীদের বিজয়ের সম্ভাবনা বাড়বে, তাহলে বিভিন্ন দলের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে।

তাঁর ভাষায়, বর্তমানে প্রতিটি দলই নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান মজবুত করার কাজ করছে।

সাদিক কায়েমকে ঘিরে জামায়াতের প্রস্তুতি

গত বছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) ভিপি নির্বাচিত হন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীদের পক্ষে তিনি সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালান এবং দলটির নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লা-র পক্ষে ভোট চান।

জানা গেছে, গত ২২ জুন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়।

এরপর ১৩ জুলাই তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। দলীয় সূত্রের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তাহলে আসিফ মাহমুদ কী করবেন?

জামায়াত সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে?

তিনি কি এনসিপির প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচন করবেন, নাকি শেষ পর্যন্ত কোনো নির্বাচনী সমঝোতার কারণে অন্য সিদ্ধান্ত হবে? আবার তাঁকে কুমিল্লা বা অন্য কোনো সিটিতে প্রার্থী করা হবে কি না, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে আসিফ মাহমুদ বলেছেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো রাজনৈতিক বোঝাপড়া হবে বলে তাঁর বিশ্বাস।

তিনি বলেন, সেটি আনুষ্ঠানিক জোট না হয়ে নির্বাচনী সমঝোতাও হতে পারে।

মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ বলেন, তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো এবং বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো উদ্যোগ হলে তা দলীয়ভাবেই হবে। তাঁর ভাষায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় ঘনিয়ে এলে পুরো চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।

৭০ শতাংশ এলাকায় প্রার্থী দিতে চায় এনসিপি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে এনসিপি ৩০টি আসনে নির্বাচন করে ছয়টিতে জয় পায়।

আসিফ মাহমুদের মতে, মাত্র ৩০টি আসনে নির্বাচন করায় দলটির তৃণমূল সংগঠন অনেক ক্ষেত্রে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়নি। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটি যতটা সম্ভব এককভাবে অংশ নিতে চায়।

তিনি বলেন, সমঝোতা হলেও এনসিপির লক্ষ্য অন্তত ৭০ শতাংশ স্থানীয় সরকার ইউনিটে নিজেদের প্রার্থী দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি। তবে নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াত, এনসিপি এবং অন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোট, আসন সমঝোতা ও প্রার্থী চূড়ান্তকরণ—সবকিছুই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স